Monday, July 28, 2008

গার্লফ্রেন্ড...! (অনুগল্প)







গার্লফ্রেন্ড...!
-রণদীপম বসু


ল্যান্ডফোনটা বেজে ওঠতেই ছিদ্দিক সাহেব ছো মেরে রিসিভারটা তুলে নিলেন। খুব মিষ্টি করে ‘হ্যা-ল্লো’ শব্দের একটা মিহি তরঙ্গ ছড়িয়ে দিলেন। কিন্তু কোথায় যেন একটা ভুল হয়ে গেলো। অবতারমার্কা হাসিমুখটা চোখ-চোয়ালসহ ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠতে লাগলো।

অফিসটার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটাকে অফিস বলেই মনে হয় না। প্রতিটা সহকর্মীর পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ার সমন্বিত প্রক্রিয়াটির সাথে একটা পারিবারিক আবহ মিশে থাকে নিবিড়ভাবে। ভাব বিনিময়ের মুক্ত পরিবেশ এতোটাই আন্তরিক, একটা পরিবারই যেন। এবং অফিসটার সবচেয়ে বড় অসুবিধাটাও হচ্ছে এটাকে অফিস বলে মনে হয় না, এটাই।

তবু ছিদ্দিক সাহেবকে আজ খুবই অসহিষ্ণু দেখালো। ‘ কী বললে ? ছেলে বৃত্তির টেস্টে টেকে নাই ! তুমি কি ঘোড়ার ঘাস কাটো নাকি ? যত্তোসব... ! ওই সব টিউশন ফি টি আমি দিতে পারবো না !’ বলেই রিসিভারটা ঠাশ করে রেখে দিলেন।

বিষয়টা পাশের ডেস্কের অরুণবাবুর চোখ এড়ালো না। হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে লাগোয়া সামনের ডেস্ক ঘেঁষে দাঁড়ালেন।
রহমান ভাই, একটা কৌতুক বলি ?
রহমান সাহেব কম্পিউটারের মনিটর থেকে চোখ ঘুরিয়ে সাগ্রহ সম্মতিতে চেয়ে রইলেন।

ভিক্ষুক: স্যার, দশটা টাকা দেন, চা খামু।
ব্যক্তি: দশ টাকা দেন মানে ! ঐ মিয়া, চা’র কাপ কতো ?
ভিক্ষুক: পাঁচ টাকা !
ব্যক্তি: তয় তুমি দশ টাকা চাইলা যে ?
ভিক্ষুক: স্যার, গার্লফ্রেন্ডরে নিয়া খামু।
ব্যক্তি: (বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে) অ্যাঁ! বলো কী ! ভিক্ষা কইরা আবার গার্লফ্রেন্ডও জুটাইয়া ফালাইছো নাকি !
ভিক্ষুক: জী না। ঐ গার্লফ্রেন্ডই তো আমারে ভিক্ষুক বানাইছে !...

হা হা হা ! শ্রোতারা মজা পেলেও ছিদ্দিক সাহেব তার কুতকুতে চোখ দুটো বড় বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ণ বানিয়ে চেয়ে রইলেন রহমান সাহেবের দিকে। রহমান সাহেব আড় চোখে খেয়াল করলেন কি না কে জানে। হাসতে হাসতে বললেন, দারুণ বানিয়েছেন তো বাবু !
আরে নাহ্ ! অরুণবাবুর উত্তর। আমি বানাইমু কী ? এই যে ডাকে এসেছে। বলেই সীলগালা ছেঁড়া খামটা দেখিয়ে দিলেন।

অতি গোপন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে মধ্যবয়সী ছিদ্দিক সাহেব তার স্ফীত শরীরটাকে চেয়ারে এলিয়ে দিলেন।
(২৮/০৭/২০০৮)
[Image: tiz_judith by Titian]

(sachalayatan)

Sunday, July 27, 2008

# সত্যি কি ভূমিকম্প !








সত্যি কি ভূমিকম্প !

সচলায়তন ভিজিট করছিলাম। হঠাৎ চাকাঅলা চেয়ারটা দুলতে লাগলো। রাত একটা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে। যা ভাবছি তা কি সত্যি ? হাঁ তাইতো ! ভূমিকম্প। কিন্ত কি আশ্চর্য কোথাও কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না কেন ? পাশের ঘরে শুয়ে থাকা স্ত্রীকে হাঁক দিলাম, তুমি কি টের পাচ্ছো কিছু ? কোন সাড়া পেলাম না। দৌঁড়ে গেলাম। দেখি নির্বিকার শিশুসন্তানের কপাল বুলিয়ে হয়তো কোন ভবিষ্যৎ স্বপ্নে বিচরণ করছে জেগে জেগে। বললাম, কী ব্যাপার, কিছু টের পাওনি ?
কই না তো !
বুঝলাম ভূমিকম্পের মাত্রা খুব বেশি ছিলো না।
অথচ আমি তখন কী করবো কী না করবো, এই রাতে ঢাকার মিরপুরের নির্জন ফ্লাটের খাঁচাবন্দী খরগোশের মতো তড়পাচ্ছি। এই যদি বিল্ডিংটা ধ্বসে পড়ে ! বেরোব কী করে ! গেইটে যে স্পেশাল লক, ওটার চাবি তো আমার মতো ভাড়াটেদের কাছে নেই ! মৃত্যুটা কি গার্মেণ্ট শ্রমিকদের মতোই হবে ?
যাক্, শেষ পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এলো। আর স্বাভাবিক বলছি কেন ? অস্বাভাবিক হলোই বা কখন ? আশেপাশে সবাই ঘুমে ব্যস্ত। বুঝাই যায় অল্পমাত্রার ভূমিকম্প কারো স্বাভাবিকতায় কোন ব্যাঘাত ঘটায় নি। শুধু আমার মতো রাত জেগে জেগে যারা আকামের ঘটি পুরছেন আর ঢালছেন, তারাই হয়তো......।

ভূমিকম্প নিয়ে আমার অস্থির হয়ে ওঠার কারণ হয়তো অবচেতনে ঢুকে যাওয়া আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যৎ বাণী, ঢাকায় তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প হলে সত্তর ভাগ বাড়িঘর ধ্বসে পড়ে একটা বিপর্যয় ঘটে যাবে মুহূর্তেই। তাৎক্ষণিক যারা মারা যাবে তারাতো গেলোই। কিন্তু যারা বেঁচে যাবে তাদের পরবর্তী মৃত্যুটা হবে আরও করুণ। একটা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের অসহায় শিকার হয়ে গ্যাসহীন পানিহীন বিদ্যুৎহীন আশ্রয়হীন খাদ্যহীন উদ্ধার-তৎপরতাহীন অচিন্তনীয় নরকের দিশদশাহীন এক অনিবার্য অনিশ্চতায় অতঃপর মরে পচে গলে.....। আহ্, চিন্তা করতেও শিরশির করে ওঠে সত্তা।

আমাদের আগামী গন্তব্য কি এতোই অনিশ্চিৎ ! আরো অসংখ্য অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভূমিকম্পের মারাত্মক সম্ভাবনার বেল্টে দাঁড়িয়ে ভাবি, সবার চোখের সামনে ঢাকার রাংগস ভবনে একজন শ্রমিকের লাশ যেখানে মরে পচে গলে আটকে থাকে তিনদিন, সেখানে এতোবড়ো ধ্বংসযজ্ঞ সামলে ওঠে এই ঢাকা আদৌ কি আর কখনো বাসযোগ্য নগরী হয়ে ওঠতে পারবে ? না কি আগামীর বাসযোগ্যহীন এক অভিশপ্ত নগরীর দুর্ভাগা নাগরিক আজ আমরা পলে পলে এগিয়ে যাচ্ছি কোন জঘন্যতম পরিণতির দিকে...?
[somewhereinblog]
[amarblog]
[pechali]

Thursday, July 24, 2008

# ‘সচল’ আগুনে পুড়ে, দূরাগত বাঁশি ফুঁকে কেউ...






‘সচল’ আগুনে পুড়ে, দূরাগত বাঁশি ফুঁকে কেউ...
- রণদীপম বসু


প্রতিটা মানুষেরই কদাচিৎ অসুস্থ হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্যেই যে, তাতে করে সুস্থ থাকার আনন্দটা আত্মস্থ হওয়ার একটা অভাবিত সুযোগ ঘটে। কেবলই সুস্থ থাকার বৈচিত্র্যহীন অভ্যস্ততায় যারা ভোগেন, এ ক্ষেত্রে এরা দুর্ভাগা বৈ কি। সুস্থ আছেন কি না, এটাও বুঝে ওঠার উপলব্ধিটা হয়তো বা তাদের ভোঁতাই হয়ে যায়। আর ভোঁতা হওয়া উপলব্ধির লিঙ্ক ধরে আরো অনেক কিছুই যে ভোঁতা হতে শুরু করে দেয়, তা আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সময় মতো বুঝে ওঠতে পারি না। আর সময় পার করে আসা আত্মোপলব্ধি শেষ পর্যন্ত কী কাজে লাগে, তাই বা কে জানে ! জায়গা জমি হারিয়ে চাষের ‘ভাইল’ বোঝার মতো হয়তো তখন কেবল আপ্তবাক্য জপা-ই সার !

ভার্চুয়াল জগতে আমার ‘অনুপ্রবেশ’ অনেক দেরিতেই। চাকুরির ধরন অনুযায়ী দীর্ঘকাল মফস্বলের প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে চাকুরির সুবাদে পারসোনাল অন লাইন কম্পিউটার রাখার কোন সুযোগই ছিলো না। ‘নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম, বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পাঠাইতাম’ এর মতোই পত্র পত্রিকায় যেটুকুই লেখালেখি করতাম, ক্রমান্বয়ে গোষ্ঠিবদ্ধ হয়ে ওঠা মিডিয়াগুলোর চেহারায় অপরিচিতির স্বরূপ স্পষ্ট হতে থাকায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না। অনুকম্পার বিনিময়ে লেখক-আত্মা বিকিয়ে দেয়ার অভিপ্রায় আমার যে গড়ে ওঠেনি। এ জন্যেই কি নির্বোধ আমার কখনো কোন পত্রিকা অফিস থেকে জমে থাকা প্রাপ্য লেখক সম্মানি তোলার জন্যেও ঢাকায় আসা হয়নি ? কিছু কিছু নামীদামী পত্রিকা ম্যাগাজিন তো এখন বন্ধই হয়ে গেছে। এমন আর কেউ আছেন কি না জানি না, তবে আমি যে দীর্ঘদিন যাবৎ লেখালেখি করেও সরকারি বেসরকারি পত্রিকা ম্যাগাজিন থেকে এযাবৎ কোন লেখক সম্মানি তুলতে যাই নি, এটা কি শুধুই টাকার চাওয়ার ব্যাখ্যাহীন জড়তার লজ্জা, না কি নির্বুদ্ধিতা, এখনো নির্ধারণ করে ওঠতে পারি নি। ভাগ্যিস ভার্চুয়াল জগতে এসবের টানপোড়েন নাই বলেই মনে হয়।

১৫ জুলাই ২০০৮ থেকে অনলাইন রাইটার্স কমিউনিটি ব্লগ ‘সচলায়তন’ ব্লক হয়ে গেলেও তা যে ব্লক হয়ে যাওয়া বা অন্য কোন কারণে বাংলাদেশ থেকে দেখা যাচ্ছে না বা ঢুকা যাচ্ছে না, তা বুঝে ওঠার আগ পর্যন্ত আমার পিসি’র ইলেকট্রনিক বা অন লাইন সমস্যা বলেই ধরে নিয়েছিলাম। প্রকৃত বিষয়টা জানার পরেই কেন জানি প্রথমেই উপরোক্ত কথাগুলো মনে এলো আমার। আগে পরে অনিয়মিত হলেও সচলায়তন ছাড়াও সামহোয়ারইনব্লগ, আমার ব্লগ, প্যাঁচালী এবং মুক্তমনা, সাতরঙ ও বাসভূমির মতো অনলাইন ব্লগ ও পত্রিকা ফোরামগুলোতে কম বেশি লেখালেখি করার চেষ্টা করি। কিন্তু সচলায়তন ব্লক হওয়ার পর বুকের গভীরে কোথায় যেন একটা পাড় ভাঙার শব্দ শুনতে লাগলাম ! তবে কি আমি অজান্তেই সচলের প্রতি অধিকতর পক্ষপাতি হয়ে ওঠছি ?

ভার্চুয়াল জগতের বাংলা পাড়ায় একটা ঝড় ওঠলো যেন। অন্য সবগুলো ব্লগ ফোরামে সচলায়তনকে নিয়ে ভীষণ তোলপাড় করা পোস্টের পর পোস্ট। ভালোয় মন্দয় মিলিয়ে এক হুলুস্থুল কারবার। কেউ সচলের পক্ষে কেউ বিপক্ষে। কেউ সচলের এই দুর্দিনে সহানুভূতির গলা বাড়িয়ে গলাগলি করতে চাইছে, কেউ আবার বুকের সমস্ত অন্ধকার খুলে চেপে রাখা গালাগালিগুলো উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। প্রতিকূল সময়ের আগুনে সচল যখন পুড়ছে, আগুন নেভানোর প্রয়াস নিতে ছুটে আসছে কেউ, কেউ বা ক্ষোভের আগুন যুক্ত করে কটাক্ষের আলু পোড়া দিচ্ছে সেই নির্দয় আগুনে ! আর কেউ কেউ নিরোর মতো বাঁশি বাজানোর কৌশল রপ্ত করছে। পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে কেউ কি নিরাপদ থাকে ? অথচ কী আশ্চর্য ! জগৎটা আসলেই বড় বিচিত্র !

আগে জানতাম, একমাত্র টাকাই এমন শক্তিশালী বস্তু যে লেনদেনের মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরটাকে এক টানে বাইরে নিয়ে আসে ! এখন দেখছি টাকার ভাইবেরাদরও রয়ে গেছে আরো ! তবে সচলের এই দুঃসহ পরিস্থিতি আমার মতো নবীন ব্লগারের জন্য যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হলেও অন্যদিকে লাভও হয়েছে বিস্তর। ‘অভিজ্ঞতা মানেই জ্ঞান’-এর দৃষ্টি দিয়ে মানুষের ভেতরের কুকুর আর দেবতার অস্তিত্ব বিষয়ক ধারণাগুলো আরেকটু পুষ্ট হয়েছে নিশ্চয়ই। সচলকে নিয়ে সচল হয়ে ওঠা ভার্চুয়াল কমিউনিটির এই আলোচনা সমালোচনা দেখে ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রনেতা লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সেই বিখ্যাত উক্তিটা যে শুধু সমকালীনই নয়, সর্বকালীনও, তা আবারো প্রমাণীত হলো- `Nobody kicks a dead dog.’.

বিচিত্র দুনিয়া, বিচিত্র দুনিয়ার মানুষ, আরো বিচিত্র মানুষের মন। ব্যান হোক বা প্রাযুক্তিক গোলযোগই হোক, ‘সচলায়তন’ যে আসলেই একটা ‘কিছু’, সমসাময়িক এই ঘটনার আগে অনেকেই আমরা তা ভালোভাবে উপলব্ধি করিনি বলেই মনে হয়। হয়তো তা সচলায়তনের জন্য শাপে বর হয়েই ধরা দেবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে ভার্চুয়াল জগত সংশ্লিষ্ট সবাই যদি এ ঘটনা থেকে বিশেষ কোন সংবেদনশীল মেসেজ আবিষ্কার করতে পারেন, বোধ করি সেটাই হবে এখনকার মতো বড় কোন পাওয়া। তবু সব কথার সার কথা একটাই, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী মুক্তমনা মানুষের কথা বলার আপোষহীন অধিকার নিয়ে সচলায়তনকে ফের বাধাহীন ফিরে পেতে চাই। কথা বলার অধিকার মানষের জন্মগত, মৌলিক অধিকার।

এই দুঃসহ বেলায় সচলে ঢুকতে পারি আর না পারি, যে বোধটা ফের অর্জিত হলো, এটা মানতেই হবে যে, অভিজ্ঞতা মানেই জ্ঞান ; জ্ঞান মানেই চলমান অভিজ্ঞতা !
(২৪/০৭/২০০৮)
[Image: 'The thinker' by Auguste_Rodin]

(sachalayatan)

Sunday, July 20, 2008

# সাহিত্যে ছড়ার অবদান কতটুকু, সংশয় কোথায় ?






সাহিত্যে ছড়ার অবদান কতটুকু, সংশয় কোথায় ?
-রণদীপম বসু


সাহিত্যে ছড়ার অবদান কী, বা এর অবস্থান কোথায় ? এ রকম বালখিল্য প্রশ্ন শুনে আঁতেল ব্যক্তিরা হয়তো এক চিমটি মুচকি হাসি দুলিয়ে চলে যাবেন প্রসঙ্গান্তরে। আর আমার মতো মোটাবুদ্ধির লোকেরা ? হয়তো চেয়ে থাকবেন হতভম্ব হয়ে প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে। কিন্তু কেউ কি একবারও ভেবে দেখেছেন, হাজার বছরের শ্রুতি-পরিক্রমায় এসেও সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন আর মাটিবর্তী লোকায়ত এ মাধ্যমটিকে নিয়ে এরকম প্রশ্নের সংযোগ সূত্রটি কোথায় লুক্কায়িত ? মাটিলগ্ন গণমানুষের জনভাষ্যের প্রতীকী বিন্যাসে উপস্থাপিত জ্যান্ত ছড়াকে নিয়ে এরকম ধোয়াশা সাহিত্যের কুলীন অঙ্গনে যতোই অস্পষ্টতা ছড়াক না কেন, ব্রাত্যজনের প্রাণের সম্পদ টিকে থাকার চাবিকাঠিটা যে ব্রাত্যজনগোষ্ঠীর হাতেই চিরকাল থেকে যায়, এটা আমরা অনেকেই ভুলে যাই। কিন্তু মহাকাল ভুলে না ঠিকই। আর ভুলে না বলেই শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে মেনে নিতেই হয় যে, সাহিত্যের পালকিটাকে সম্মুখবর্তী হতে হলে ওই ব্রাত্যজনের কাঁধে চড়েই এগুতে হয় তাকে।

কাসুন্দি
ছড়া সাহিত্যের সম্প্রতি প্রকাশিত দু’পাতার একটা প্রকাশনা ‘নিব’ ওল্টেপাল্টে দেখছিলাম। এক জায়গায় এসে চোখ আটকে গেলো। চার লাইনের ছোট্ট একটা ছড়া। ‘ভাতের বদলে আলু / বাবার বদলে খালু / এর চেয়ে তো ভালোই ছিলো / তারেক জিয়া, ফালু।’

একবার পড়েই গেঁথে গেলো মনে। ছড়াটা ছোট্ট, কিন্তু এর ইফেক্টটা কি ছোট্ট রইলো ? মাথার ভেতরে ঢুকে রিনিরিনি বাজাতে লাগলো। দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় আমাদের বহুমাত্রিক নিষ্পেষণের চিত্রগুলোর একটা লিঙ্ক কী চমৎকার ইঙ্গিতময় দক্ষতায় জুড়ে দেয়া হলো ! যেগুলো আনন্দচিত্র নয়, কষ্টচিত্র। ভুক্তভোগী মানুষের বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্টক্ষত। সামান্য ক’টা অক্ষরের যাদুতে ছবির পর ছবি হয়ে যেন ভেসে ওঠতে লাগলো। কৌতুহলী হয়ে মনে করতে চেষ্টা করলাম, মুহিববুল্লাহ জামী নামের এই লেখক বা ছড়াকারের অন্য কোন লেখা আগে পড়েছি কি না। মনে করতে পারলাম না। সম্পূর্ণ অপরিচিত এই ছড়াকারের নাম আগে কোথাও শুনেছি বলেও মনে হলো না। হতে পারে আমার সীমাবদ্ধতা এটা। কিন্তু বিষয়টা উত্থাপিত হলো ক’দিন যাবৎ সাহিত্যে ছড়ার অবস্থান বা অবদান নিয়ে ভাবনার সূত্র ধরে।

বিকেলের এক চায়ের আড্ডায় প্রসঙ্গক্রমেই ছড়াটা আউড়ালাম আবার। এবং উপস্থিত যারা ছিলো, লুফে নিলো সবাই ! যদিও এরা সাহিত্য জগতের কেউ নন বা সাহিত্য রসিকও বলা যাবে না, তবু ছড়াটার প্রতি তাদের আগ্রহে একটুও কমতি দেখলাম না। অখ্যাত হবার কারণে ছড়াকারের নামটা তাদের মনে না থাকলেও ছড়াটা ভুললো না কেউ। বোধ করি সহজে ভুলবেও না। হয়তো বা মুখে মুখে ছড়িয়ে যাবে আরো। মুখোমুখি অভিজ্ঞতায় বিষয়টা আমার কাছে খুবই উল্লেখযোগ্য মনে হলো। এখানেই প্রশ্ন আসে, সাহিত্যে ছড়ার অবস্থান কতোটা ব্যাপৃত, কতোটা গভীর !

ছড়াটার শিল্পব্যাকরণ বিশ্লেষণ করলে এতে যে ইঙ্গিতময়তায় স্থূলতা রয়েছে বোঝাই যায়। তবু জনমানুষের বহমান দুঃখ কষ্ট অক্ষমতা জীবন সংগ্রামের অনিশ্চয়তা প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ধারণ করতে পেরেছে বলেই কি এটা সাধারণ শ্রোতা বা পাঠকের কাছে সময়ের সাহিত্য প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে ? হয়তো। হিউমার আশ্রয়ী প্রচণ্ড রাজনীতি সংশ্লিষ্ট সামাজিক এ ছড়াটিকে কিছুতেই ছেলেভুলানো ছড়া বলা যাবে না। বরং সুনিশ্চিৎভাবেই বুড়ো জাগানো ছড়া এটা। সফলভাবেই যে কাজটা করলো, খোঁচা দেয়া। কবিতায় যা কখনোই সম্ভব হতো না। এখানেই কবিতা ও ছড়ার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য। বলা হয় কবিতা সাহিত্যের উৎকর্ষ মাধ্যম। যার সম্ভ্রান্ত অবস্থান সাহিত্যের শীর্ষে। তা হলে ছড়ার অবস্থান কোথায় ? এর সুলুক-সন্ধানে যাবার আগে একটু স্মৃতিচারণ করে নেয়া যাক ?

এ প্রসঙ্গে আমাদের শৈশবে বা কৈশোরে পঠিত এবং সবার মুখে মুখে চর্চিত সেই ছেলেভুলানো ছড়াগুলোর উদাহরণও টানতে পারি, যেগুলোর রচনাকার অজ্ঞাত এবং যাকে এখন লোকছড়া বা আদিছড়া নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। যেমন- ‘খোকন খোকন ডাক পারি / খোকন গেলো কার বাড়ি / আয়রে খোকন ঘরে আয় / দুধমাখা ভাত কাকে খায়।’ শৈশবের কল্পচোখে এ ছড়াটার যে নির্দোষ ব্যঞ্জনায় আপ্লুত হয়েছি আমরা, বড় হতে হতে জেনে গেছি এটা সে অর্থে নির্দোষ ছড়া নয় কিছুতেই। এখানে দুর্দান্ত প্রতীকাশ্রয়ে আমাদের শত শত বছরের জাতিগত ইতিহাস বিধৃত। যুগে যুগে বহিশত্রু অপশক্তির কালো থাবা থেকে মায়ের সন্তান যে খোকনরা বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে নিজেদের প্রাণ বাজী রেখে দেশকে আগলে রেখেছে, মাকে নিরাপদ রেখেছে, সে মায়ের সন্তানরা আজ কোথায় ? সন্তানের জন্য মায়ের নিভৃত আঁচলে রাখা স্নেহের সম্পদ দুধমাখা ভাতের প্রতীকী আশির্বাদ গ্রাস করছে আজো কতো অপশক্তি। মা যে আজ অরক্ষিত। কিন্তু সেই খোকনরা কোথায়, যারা মাকে নির্ভয় নিরাপদ করে তুলবে ? এগুলো ঘুম পাড়ানো ছড়া নয়, ঘুম ভাঙানো ছড়া।

অথবা ধারণামতে নবাব আলীবর্দী খাঁ’র আমলের দুঃসহ সময়কে ধরে রাখা সেই বুকে ইতিহাস উৎকীর্ণ করা ছড়াটি ? ‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেবো কিসে ?/ ধান ফুরুল, পান ফুরুল খাজনার উপায় কি ?/ আর কটা দিন সবুর কর, রসুন বুনেছি।’ এগুলো যদি শুধুই ছেলে ভুলানো ছড়া হতো, জীবনের অবিচ্ছিন্ন কষ্ট ধারণ করে জনমানুষের প্রাণের আকুতি না হতো, তবে শুধুমাত্র মুখে মুখে প্রচলিত শ্রুতিনির্ভর এই লোকায়ত শ্লোকসদৃশ ছড়াসম্পদ শত শত বছর পরিভ্রমন করে একালে এসে পৌঁছা কি চাট্টিখানি কথা ? বিপুল অহঙ্কার নিয়ে বুকের মানিক এই ছড়াগুলোকে আজ আগলে রাখছি আমরা একান্ত আপন সম্পদ হিসেবে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের হলেও আমরা জানি না এগুলো আমাদের কোন্ স্বজনরা রচনা করেছিলেন। মহাকাল আড়ালে নিয়ে গেছে তাঁদের। হয়তো আর কখনোই জানবো না আমরা তাঁদের নাম ধাম পরিচয়। আরাধনা বা বিনোদনের নিমিত্তে গীত হবার জন্য রচিত চর্যার দোহাকারদের মতো কাহ্ণুপা শবরপা কুক্কুরিপা বা আমাদের আদি কৃষিজীবী সমাজের নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে প্রয়োজনীয় প্রকৃতিলব্ধ বচন রচনাকার খনার মতো প্রতীকী নামও নেই এই লোকমুখে প্রচলিত লোকায়ত ছড়া রচয়িতাদের। এগুলোই আজ আমাদের অমূল্য সাহিত্যসম্পদ। সাহিত্যের আদি উৎস হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছি আমরা। সে বিবেচনায় এসব আদি ছড়া থেকে উৎসারিত পরবর্তী সাহিত্যস্রোতধারার গর্বিত অংশ আমরা কী করে অস্বীকার করবো যে এই ছড়াই বর্তমান বাংলা সাহিত্যের আদি মাতা !


একই অঙ্গে এতো রূপ

ইদানিং পত্র-পত্রিকা-সংকলন-ম্যাগাজিনগুলো খুললেই যে পাতাটাকে বর্জ্যের জাহাজ বললেও অত্যুক্তি হবে না, সেটা হচ্ছে ছড়া বা শিশুসাহিত্যের পাতা। এ পাতাটা শিশুরা লেখে না। লেখে বুড়োরা, শিশুর বাবা-চাচা-দাদারা। যারা ছড়া কী, কবিতা কী বা পদ্য কী এটা বুঝেন কি না, তা বিশ্লেষণ করতে গেলে সাতকাণ্ড রামায়ন রচনা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু কুম্ভকর্ণের ঘুম আদৌ ভাঙানো যাবে কি না সন্দেহ। সম্ভবত এঁরা বর্জ্য কী, তাও বোধ করি বোঝেন না। নইলে আমাদের আগামী প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের জন্য এমন পরিত্যক্ত ছেলেমী করেন কী করে ! দুর্ভাগ্যজনকভাবে এদের বালখিল্যতার দায়ভার নিতে হচ্ছে এই ছড়া বা শিশুসাহিত্যকে, নাবালক সাহিত্যের কলঙ্ক ধারণ করে। আর এ জন্যেই মূল সাহিত্যধারায় আজকাল যারা সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে কাজ করছেন, ছড়ার প্রসঙ্গ তুললেই কুঞ্চিত কপালে ‘হুঁম, ছড়া’ বলে এমন এক বিশেষ ধরনের ভাব দেখান যে, মনে হয় ব্রাত্যজনের ছোঁয়ায় উচ্চমার্গীয় শরীরে কোথায় যেন চোট লেগে যাচ্ছে। তাঁদেরই বা দোষ দেব কী, সাহিত্যের বিশাল অঙ্গনে ছড়া যে এক ঈর্ষণীয় ঐতিহ্য ও ক্ষমতা নিয়ে ক্রমবর্ধিষ্ণু স্থানটি দখল করে আছে, এটা যেন ছড়ার অপরাধ হয়ে গেছে। হয়তো এঁরা রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলে-ভুলানো ছড়া’ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত উক্তিটাকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নিয়েছেন- ‘আমি ছড়াকে মেঘের সহিত তুলনা করিয়াছি। উভয়েই পরিবর্তনশীল, বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত, বায়ুস্রোতে যদৃচ্ছ ভাসমান। দেখিয়া মনে হয় নিরর্থক। ছড়াও কলাবিচারে শাস্ত্রের বাহির, মেঘবিজ্ঞানও শাস্ত্র নিয়মের মধ্যে ভাল করিয়া ধরা দেয় নাই। অথচ জড় জগতে এবং মানব জগতে এই দুই উচ্ছৃঙ্খল অদ্ভুত পদার্থ চিরকাল মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করিয়া আসিতেছে।’

বর্তমান ছড়াকাররা এই মহৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে কতটুকু অবগত জানি না। তবে শত বর্ষ পূর্বের এই উক্তি থেকে এটা বুঝা যায় যে ছড়া তখনও সাহিত্যের কোন শাস্ত্র নিয়মে অন্তর্ভূক্ত হয় নি। অথচ খুব কাছাকাছি সময়ে যোগীন্দ্রনাথ সরকার ‘খুকুমনির ছড়া’ নামে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছড়াগুলোকে সংগৃহিত সংকলনে প্রকাশ করে শিশুসাহিত্যের যে ভিত রচনা করেছিলেন, তারই পথ ধরে রবীন্দ্রনাথই প্রচুর শিশুতোষ ছড়া রচনা করে শিশুসাহিত্যে ছড়াকে এক নতুন মাত্রা দিয়ে গেছেন। আর সুনির্মল বসু তো তাঁর ‘আমার ছড়া’ গ্রন্থের ভূমিকায় ছড়ার প্রভাব বিষয়ে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন এভাবে- ‘আগে বিশেষ কিছু ছড়া লিখি নাই। কিন্তু আমার এই কাব্য জীবনের মূল উৎস হচ্ছে আমার সেই বাল্য-জীবনের মা-ঠাকুমার মুখে শোনা মধুঝরানো সুরেলা ছড়াগুলি। ঐ ছড়াগুলির কাছে আমি বিশেষভাবে ঋণী, ...-কারণ আমার মনে হয় ছড়া লেখা সহজ নয়। ছড়া লিখবার রীতি-নীতি ও পদ্ধতি সাধারণ রচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।’

হতে পারে বুদ্ধি ও বিচার অপেক্ষা রসের প্রাধান্যের কারণেই শিশুতোষ ছড়াকে সাহিত্যে স্থান দিতে এতোটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন তখনকার সাহিত্যকুলীন ব্যক্তিরা। তাতে করে এই দ্বিধাটাই কালের অক্ষরে চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু ছড়া তার একই অঙ্গে বহু রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঠিকই। কালে কালে নিজকে শোভিত করেছে যাপিত জীবনের নানান অসঙ্গতি তুলে ধরে এর বিরূদ্ধে গড়ে তোলা হাস্যরস, স্যাটায়ার, কটাক্ষ, শ্লেষ, ঘৃণা, ক্ষোভ, কষ্ট ইত্যাদি বিচিত্র অনুভূতির শিল্পীত প্রকাশের মাধ্যমে। এগুলো তখন আর নিছক ছেলে-ভুলানো ছড়া নেই, সবার মনের কথাকেই ধারণ করেছে স্পষ্টভাবে। হয়তো কালের বিচিত্র পরিহাস হিসেবে এখন প্রকৃত ছড়াকারের একটা নিদানকাল চলছে। কিন্তু আমাদের সুকুমার রায় থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে নজরুল, অন্নদা শংকর রায়, আহসান হাবীব, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, এখলাসউদ্দিন আহমদ, সুকুমার বড়ুয়া, আবদার রশীদ, রফিকুল হক দাদুভাই, শাহাবুদ্দীন নাগরী, ফারুক নওয়াজ তথা লুৎফর রহমান রিটন পর্যন্ত আরো অনেক কবি ছড়াকারদের খন্ড খন্ড অবদানে সমৃদ্ধ ছড়ার ঐতিহ্য ও বৈচিত্রে টইটম্বুর থাকার পরেও কি ছড়াকে সাহিত্য হিসেবে মেনে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধার অবকাশ আছে ?

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি নামক প্রবন্ধে বলছেন- ‘সাহিত্যে লেখক যাহার কাছে নিজের লেখাটি ধরিতেছে, মনে মনে নিজের অজ্ঞাতসারেও, তাহার প্রকৃতির সঙ্গে নিজের লেখাটি মিলাইয়া লইতেছে। দাশু রায়ের পাঁচালি দাশরতির ঠিক একলার নহে; যে সমাজ সেই পাঁচালি শুনিতেছে, তাহার সঙ্গে যোগে এই পাঁচালি রচিত। এইজন্য এই পাঁচালিতে কেবল দাশ রথির একলার মনের কথা পাওয়া যায় না; ইহাতে একটি বিশেষ কালের বিশেষ মণ্ডলীর অনুরাগ-বিরাগ শ্রদ্ধা-বিশ্বাস রুচি আপনি প্রকাশ পাইয়াছে।
এমনি করিয়া লেখকদের মধ্যে কেহ বা বন্ধুকে, কেহ বা সম্প্রদায়কে, কেহ বা সমাজকে, কেহ বা সর্বকালের মানবকে আপনার কথা শুনাইতে চাহিয়াছেন। যাহারা কৃতকার্য হইয়াছেন তাহাদের লেখার মধ্যে বিশেষভাবে সেই বন্ধুর, সম্প্রদায়ের, সমাজের বা বিশ্বমানবের কিছু-না-কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। এমনি করিয়া সাহিত্য কেবল লেখকের নহে, যাহাদের জন্য লিখিত তাহাদেরও পরিচয় বহন করে।’


এটা সত্য যে, সাহিত্য হচ্ছে মানুষের অন্তর্জগতের সাথে বহির্জগতের সমন্বয়কৃত এক সৃষ্টিশীল দলিল। যেখানে মানুষ ও তার পারিপার্শ্বিক জগতের মধ্যে টানপোড়েন নেই, জীবনের গূঢ় বাস্তবতার দর্শনগত রেখাচিত্র নেই, সমকালীনতা নেই, তা কী করে সাহিত্য হবে ? সাহিত্য মানেই তো জীবনের রেখাচিত্র। ‘সহিত শব্দ হইতে সাহিত্য শব্দের উৎপত্তি। অতএব ধাতুগত অর্থ ধরিলে সাহিত্য শব্দের মধ্যে একটি মিলনের ভাব দেখিতে পাওয়া যায়। সে যে কেবল ভাবে-ভাবে ভাষায়-ভাষায় গ্রন্থে-গ্রন্থে মিলন তাহা নহে; মানুষের সহিত মানুষের, অতীতের সহিত বর্তমানের, দূরের সহিত নিকটের অত্যন্ত অন্তরঙ্গ যোগসাধন সাহিত্য ব্যতীত আর কিছুর দ্বারাই সম্ভবপর নহে। যে দেশে সাহিত্যের অভাব সে দেশের লোক পরস্পর সজীব বন্ধনে সংযুক্ত নহে; তাহারা বিচ্ছিন্ন।
পূর্বপুরুষদের সহিতও তাহাদের জীবন্ত যোগ নাই। কেবল পূর্বাপর প্রচলিত জড়প্রথাবন্ধনের দ্বারা যে যোগসাধন হয় তাহা যোগ নহে, তাহা বন্ধন মাত্র। সাহিত্যের ধারাবাহিকতা ব্যতীত পূর্বপুরুষদিগের সহিত সচেতন মানসিক যোগ কখনো রক্ষিত হইতে পারে না।’
আমাদের দেশের প্রাচীনকালের সহিত আধুনিককালের যদিও প্রথাগত বন্ধন আছে, কিন্তু এক জায়গায় কোথায় আমাদের মনের মধ্যে এক একটা নাড়ীর বিচ্ছেদ ঘটিয়াছে যে, সেকাল হইতে মানসিক প্রাণরস অব্যাহতভাবে প্রবাহিত হইয়া একাল পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিতেছে না। আমাদের পূর্বপুরুষরা কেমন করিয়া চিন্তা করিতেন, কার্য করিতেন, নব তত্ত্ব উদ্ভাবন করিতেন- ...... কী ভাবে সমাজ প্রতিদিন বৃদ্ধিলাভ করিত, পরিবর্তন প্রাপ্ত হইত, আপনাকে কেমন করিয়া চতুর্দিকে বিস্তার করিত, নূতন অবস্থাকে কেমন করিয়া আপনার সহিত সম্মিলিত করিত- তাহা আমরা সম্যকরূপে জানি না।’......
... এইরূপে সাহিত্যের অভাবে আমাদের মধ্যে পূর্বাপরের সজীব যোগবন্ধন বিচ্ছিন্ন হইয়া গেছে।’

রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত আক্ষেপ যথার্থ ছিলো এজন্যেই যে, আমাদের হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতির ছিটেফোঁটা যেটুক জানি আমরা তা নগন্য বৈ কি। আমাদের সংস্কৃতির বয়স কি হাজার বছর ? কেন এর বেশি নয় ? কারণ আদি নিদর্শন হিসেবে আমাদের চর্যাপদই তার সাক্ষ্য। এর আগের কোন নমূনা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু এই হাজার বছরের মধ্যেও একটা বিরাট সময় অন্ধকারে রয়ে গেছে। যেগুলো আলোকিত, তা আমরা তৎকালীন সাহিত্যকৃতির মধ্যে দিয়েই দেখছি বলে। আর এই সাহিত্যকৃতি মানেই আমাদের লোকসাহিত্য। এবং এটা তো স্বীকৃত যে লোকসাহিত্যের উজ্জ্বল নিদর্শনগুলোই হচ্ছে আমাদের লোকায়ত ছড়াগুলো।

টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী/ হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী/ বেঙ্গস সাপ চঢ়িল জাই/ দুহিল দুধু কি বেণ্টে সামাই/ বলদ বিআএল গবিআ বাঁঝে/ পীঢ়া দুহিআই এ তীনি সাঝে/ জো সো বুধী সোহী নিবুধী/ জো সো চোর সোহি সাধী/ নিতি নিতি সিআলা সিহে সম জুঝই/ ঢেণ্ঢণ পাএর গীত বিরলে বুঝই।
 (চর্যাপদ ৩৩ / ঢেণ্ঢণপাদানাম )

[বস্তিতে আমার ঘর, প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই, (অথচ) প্রেমিক (ভিড় করে)। ব্যাঙ কর্তৃক সাপ আক্রান্ত হয়। দোয়ানো দুধ কি বাঁটে প্রবেশ করে ? বলদ প্রসব করল, গাই বন্ধ্যা, পাত্র (ভরে তাকে) দোয়ানো হ’ল এ তিন সন্ধ্যা। যে বুদ্ধিমান, সেই নির্বোধ, যে চোর সেই সাধু। নিত্য নিত্য শৃগাল যুদ্ধ করে সিংহের সঙ্গে। ঢেণ্ঢণপাদের গীত অল্প লোকেই বুঝে।]
অথবা,
‘...... অপনা মাঁসে হরিণা বৈরী/ খনহ ণ ছাড়ই ভুসূকু অহেরী।’
-(চর্যাপদ/ ভুসূকুপাদ)
[আপন মাংসের জন্য হরিণ সকলের শত্রু। এক মুহূর্তের জন্যেও শিকারী ভুসূকু (তাকে) ছাড়ে না।]

দোহার আড়ালে এর অন্তর্নিহিত ভাব যাই হোক, হাজার বছর আগের আমাদের পূর্বপুরুষদের সামাজিক অবস্থাটা যে এখানে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় স্পষ্টই আঁকা হয়ে আছে তা আমাদেরকে বুঝে নিতে খুব বেগ পেতে হয় না।

ঘুমপাড়ানো ছড়া হিসেবে বহুল উদ্ধৃত ছড়া ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো..’ তে নবাব আলীবর্দী খাঁর সময়কালে বর্গীদের যখন তখন উৎপাতে তটস্থ এই বাংলার জনপদে রাতের নির্জনে শিশুকে ঘুম পাড়াতে গিয়েও যখন বর্গীর ভয় দেখানো হয়, তখন কি আর বোঝার বাকি থাকে আমাদের সে আমলের পূর্বপুরুষদের সামাজিক অবস্থা কী ছিলো ?

‘ডেকে ডেকে খনা গান/ রোদে ধান ছায়ায় পান।’ বা ‘ষোল চাষে মূলা/ তার অর্ধেক তূলা/ তার অর্ধেক ধান/ বিনা চাষে পান।’ খনার বচন থেকে প্রাপ্ত এরকম আরো বহু ছড়া কি সাক্ষ্য দেয় না একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে আমাদের কৃষিভিত্তিক সমাজের দৈনন্দিনতায় ধান পানের মতো অত্যাবশ্যকীয় উপকরণগুলোর মাজেজা ?

আধিপত্যবাদী বৃটিশকে এই উপমহাদেশের সাধারণ জনগোষ্ঠি যে কখনোই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি তার নজির ইতিহাসের পাতায় পাতায় উৎকীর্ণ আছে। যদিও এ ইতিহাস রচয়িতারা কোন সাধারণ মানুষ নন। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তির আঁচটুকু পেয়ে যাই আমরা শ্রুতিনির্ভর ছড়ার মধ্য দিয়েই। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই সহজ সরল মানুষগুলো বৃটিশদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে কী চোখে দেখতো তার একটি নমূনা এই ছড়াটি, যা আমাদের শিশুপাঠ্যও ছিলো। ‘রেলগাড়ি ঝমাঝম/ পা পিছলে আলুর দম।’ এটা সেই সময়কালটাকেই ধারণ করে আছে যখন এদেশে প্রথম রেলগাড়ির প্রচলন হচ্ছিলো।

একইভাবে বাঙালীর নিজস্ব প্রচলিত ফসলি ধানের উপর জেঁকে বসা ইরি ধানের আগমনকেও যে কৃষক সম্প্রদায় খুব স্বাভাবিকভাবে নেয়নি তার প্রমাণ রয়ে গেছে এরকম ‘দেশে আইলো ইরি ধান/ আউলা ঝাউলা পাকিস্তান ’ জাতীয় প্রচলিত ছড়ায়।


এভাবে বিয়ের ছড়া, ঝাড়-ফুকের মাধ্যমে চিকিৎসার ছড়া, কন্যাবিদায়ের ছড়া, বৃষ্টির ছড়া, ফসলের ছড়া ইত্যাদির মতো শত শত হাজারো ছড়ায় চিত্রিত হয়ে আছে আমাদের গ্রাম বাংলার জীবন যাত্রার প্রতিটা পালা-পার্বন উৎসব অনুষ্ঠানে প্রচলিত সামাজিক ক্রিয়া বিক্রিয়াগুলো ছন্দে ছন্দে পঙক্তির সমাহারে। ওগুলোই আমাদের সমাজের টুকরো টুকরো হাজারো আয়না। আমাদের আপন চেহারা। আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক ইতিহাস। আমাদের বিচিত্রতর দুঃখ আনন্দের জীবন্ত দলিল। ওগুলোই আমাদের সংস্কৃতি, আদি ও অকৃত্রিম সাহিত্য।

অতএব ছড়া সাহিত্য কি না, এরকম বালখিল্য জিজ্ঞাসার চাইতে বরং আমাদের সাহিত্যে ছড়ার অবস্থান বা অবদান কোথায় এর উত্তরে যদি পাল্টা প্রশ্ন ওঠে আমাদের শরীরে রক্তের অবস্থান বা অবদান কোথায়, তবে উত্তর দাতার নীরবতাই বুঝিয়ে দেবে প্রশ্নকর্তার হঠকারী দৃষ্টিভঙ্গির সাযুজ্য কতটুকু। একান্ত নির্জ্ঞান বা জ্ঞানপাপী ছাড়া এমন হঠকারী বিতর্কের সূচনা প্রয়াস আজ এই সময়কালে এসে আর কারো দ্বারা কি সম্ভব ? এর পরেও যখন এই প্রশ্ন উত্থিত হতে দেখা যায় কোথাও, তার প্রেক্ষিত আসলে অন্যত্র। এ জন্য একমাত্র দায়ী হতে পারে আমাদের বর্তমান মেধাশূন্য ছড়াকাররাই। তা বলে সবাই কি মেধাশূন্য ? অবশ্যই নয়। অনেক মেধাবী ছড়াকার আমাদের দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু চাল ডাল তেল মায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণকারী জনস্বার্থ বিরোধী সিন্ডিকেটের মতো আমাদের সাহিত্যজগৎটাও আজ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। অতএব ছড়াসাহিত্যই বা বাদ যাবে কেন ! গোষ্ঠীপ্রীতির তৈলাক্ত মর্দনে অনভ্যস্ত আমাদের মেধাবী ছড়াকাররা তাই আজ মিডিয়ার অন্তরালে প্রতিভার শলতে জ্বালিয়ে চর্চা করে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এই আলোর রেশ বেশিদূর যাবার সুযোগ না পেয়ে প্রকৃত অর্থে সাহিত্যকেই বঞ্চিত করছে। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য।

যা সত্যি, তাই বাস্তব

যদিও এটা সুস্থমস্তিষ্কধারী কারোরই কাম্য হতে পারে না, তবু কথার কথা হিসেবে যদি বলা হয় যে, হঠাৎ কোন মহাবিপর্যয়ে যদি মানুষের এই ঝলমলে সভ্যতা হঠাৎ একদিন ধ্বংস হয়ে যায় ! কিছু সংখ্যক মানুষই বেঁচে থাকে শুধু, আর কিছু নয় ! এবং সমস্ত লিখিত সাহিত্য ইতিহাস নিশ্ছিন্ন হয়ে যায়, কী হবে তখন এ জাতীর সাহিত্য ভাগ্য ? একটা যুক্তিসঙ্গত কাল পেরিয়ে এসে পুনরায় লিখিত হবে যা, তা কি আমাদেরকে ফের সেই শ্রুতি ও স্মৃতিনির্ভর লোকসাহিত্যধারার কথাই মনে করিয়ে দেবে না ? গল্প উপন্যাস হারিয়ে যাবে, কবিতার করুণ কান্নাও হয়তো শোনা যেতে পারে ; একমাত্র ছড়াই তার পূর্ণ অস্থিত্ব নিয়ে এগিয়ে আসবে জনমানুষের একান্ত আপন অনুভূতি আর নিজস্ব আয়না হয়ে। যদিও এই আশঙ্কা এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে সত্যি হবে না বলেই বিশ্বাস, তবু এটা তো ঠিক যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে আশ্রয় প্রশ্রয়ে যা থেকে যায়, বেড়ে ওঠে, পল্লবিত হয়, শেষ পর্যন্ত তাই টিকে থাকে। এটাই নিয়তি। সময়ের চূড়ান্ত জাজমেন্ট। আর এ ক্ষেত্রে ছড়াই পারে এই দাবী মেটাতে পূর্ণভাবে।

তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা, অথবা বীর বাঙালী অস্ত্র ধর/ বাংলাদেশ স্বাধীন কর, এই জাতীয় শ্লোগাণগুলো কি স্মৃতিবিচ্যুত হবার কোন সম্ভাবনা আছে ? এক নিমেষেই আমাদেরকে নিয়ে যায় আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর্যবান সময়কালটাতে। ভেসে ওঠে ইতিহাস, আমাদের অহঙ্কারী ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রেক্ষিত। অথবা ‘এক দফা এক দাবী/ এরশাদ তুই কবে যাবি’ বা নুর হোসেনের উদোম বুকে পিঠে আঁকা বাংলাদেশের হৃদয় ঝরানো পঙক্তি, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/ গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। নব্বই এর স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নিখাদ চেহারাটা কি লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় না ? এগুলো কি শুধু শ্লোগান ? জনমানুষের কাঙ্ক্ষিত ভাষা শ্লোগান হয়ে যায় তখনই, যখন ছড়া ও ছন্দ মিশে চেতনার মনভূমিকে আন্দোলিত করে তোলে। এটাই সাহিত্য। কারণ, সাহিত্য হচ্ছে জীবনের প্রতিচ্ছবি। সময়ের একান্ত দলিল। মূলত এটাই সাহিত্যের প্রকৃত সংজ্ঞা।

ছড়ার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, প্রভাব ও ক্ষমতা বিশ্লেষণ করলে সমকালীন সাহিত্যে এর অবস্থানকে এতো হেলাফেলার চোখে দেখা হবে কেন ? আসলে গলদ এই প্রশ্নটার মধ্যেই। সাহিত্যে ছড়াকে কখনোই অবহেলা করা হয় নি। অবহেলা বলতে যে বিষয়টিকে বোঝানো হয়ে থাকে, তা মূলত কিছু সংখ্যক ব্যক্তির কারণে কিছু সংখ্যক ব্যক্তির দ্বারা প্রকৃত বিষয় চিহ্নিতকরণে সীমাবদ্ধতার ফলে বিষয়-বিশ্লিষ্ট হয়ে যাওয়া। ছড়ার নাম দিয়ে যা ইচ্ছে তা ছন্দে ছন্দে বসিয়ে দিলেই যদি ছড়া হয়ে যেতো, তাহলে সমিল কবিতা, পদ্য বা গীত হওয়ার জন্য লিখিত গানের নামে আলাদা কোন সাহিত্য বিভাগই সৃষ্টি হতো কি না সন্দেহ। যার চিকিৎসা যথাসময়ে মহাকালই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে নেয়। কাউকে না কাউকে দিয়ে করিয়ে নেয়। এখানেই ছড়াসাহিত্যে সমালোচনা সাহিত্যের প্রয়োজনীতা ও গুরুত্বও টের পেয়ে যাই আমরা। যদিও এই সমালোচনা আমাদের ছড়াসাহিত্যে উল্লেখযোগ্যভাবে গড়ে ওঠেনি এখনো। তা গড়ে ওঠলেই বরং নিঙড়ানো আগাছার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ছড়াগুলো। তাই যারা ছড়ার নাম দিয়ে অছড়ার চাষ করছেন প্রতিনিয়ত হাজারে-গণ্ডায়, প্রকৃত অর্থে এরাই ছড়াকে ঠেলে দিচ্ছেন অবহেলার শুকনো উঠোনে। এর সাথে সাথে পাঠক বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত ছড়া থেকে, আর সাহিত্য হারাচ্ছে তার মেধাবী ছড়াকারদের নতুন নতুন উৎস সন্ধানের সম্ভাবনাকেও।

এর পরেও কি আমাদের তথাকথিত সামগ্রিক পাঠাভ্যাসহীন ছড়াকারদের বোধোদয় হবে না ?

[muktangon-nirmaanblog]

Saturday, July 19, 2008

# এই দুঃসহ বেলায় যেভাবে সচলায়তনে ঢুকলাম আমি...





এই দুঃসহ বেলায় যেভাবে সচলায়তনে ঢুকলাম আমি..
রণদীপম বসু

গত ১৫ জুলাই ২০০৮ থেকে এক অজ্ঞাত কারনে কিছুতেই সচলায়তনে একসেস পাচ্ছি না। প্রথমে সাময়িক ত্রুটি ভেবে গা করিনি। কিন্তু দীর্ঘ ব্যবধানে এসেও যখন ঢুকতে পারছিলাম না, কেন জানি একটা অমঙ্গল আশঙ্কায় দুলে ওঠলাম। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। তবে কি সচলেও খড়্গ নামলো ! অদৃশ্য কালো হাতের কাছে তবে কি আবারও মুক্ত মন আর স্বাধীন চেতনা মার খেয়ে যাবে ? প্রচণ্ড একটা অস্থিরতা নিয়ে চাপা ক্ষোভ আর অব্যক্ত ঘৃণাই হয়ে ওঠলো সাময়িক সান্ত্বনা। কিন্তু সচলকে আর পাবো না, এটা কী করে হয় ! বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী আমার ইচ্ছে হচ্ছিল হাউমাউ করে কাঁদি কতক্ষণ। কিন্তু কেন কাঁদবো ? যারা একে রুদ্ধ করতে কালো হাত বাড়িয়েছে, এদের জন্য এক দলা ঘৃণা ছুঁড়ে দিলাম।
প্রতিদিন সচলের লিঙ্কে ক্লিক করি অসম্ভব আশা নিয়ে। কিন্তু না। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। অন্য কোন ব্লগেও ঢুকতে ইচ্ছে হলো না। শেষে কোন ক্লু পাই কি না, এ আশায় আজ সামহোয়ারইন-এ ঢুকলাম এই রাতজাগা ভোররাতে। ঢুকেই দেখি 'মাসুদ যা বলেছেন ঠিকই' নিকের 'বাংলাদেশ থেকে সচলায়তন পড়তে চাইলে আমার কথা শুনুন' পোস্টটি, চোখ আটকে গেলো। সেখানে আমার মতো প্রযুক্তিকানা'র জন্য যে একসেস লিঙ্কটি দেয়া ছিলো, সেটাকেই ভরসা করে আশায় বুক বাঁধলাম। ওখানে বলেছে ফায়ার ফক্স ব্যবহার করতে। কিন্তু আমার যে ইন্টারনেট এক্নপ্লোরার ভরসা ? তবু দেখি হয় কিনা। ওমা, সত্যি সত্যি পেয়ে গেলাম ! নাচতে ইচ্ছে হলো ! যদিও সচলকে সচলের চেহারায় পেলাম না, তবু সেই মন শীতল করা সচল তো ! দেখা যাক তারপর কী হয়। কিন্তু কমেন্ট করা বা লগ ইন করার কোন সুবিধাই পাচ্ছি না যে ? সচলায়তনের পোস্টটা পড়ে আমার আশঙ্কার সত্যতায় নিশ্চিৎ হলাম । আর লজ্জায় হতাশায় নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলাম, আমরা কি আসলেই নিজেকে স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে সত্যি সত্যি দাবি করতে পারি ? দুঃখে ক্ষোভে অপমানে নিজকে গাল দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় আছে ?! যাক্, ভাঙাচোরা সচলায়তনে ঢুকলাম তো ঠিকই,কিন্তু লগ ইন করবো কী করে ? অবশেষে একটা পোস্টের (থার্ড আই) একাউন্টে ক্লিক করতেই লগইন-এর ছিদ্রটা পেয়ে গেলাম। আর পায় কে !
ইউজার নেমের বক্সে কী চাপতেই ফের চোখ চড়ক গাছ ! বাংলা ফণ্ট তো আসছে না ! এখন উপায় ? আমার ইউজার নেম আবার বাংলায় ! অবশেষে সেই পুরনো পন্থা। মাহবুব মোর্শেদ ও অরূপ কামালের বাংলা ওয়েব টুলস-এর সহায়তায় বাংলা ফণ্ট দিয়ে পাসওয়ার্ড দিতেই কেল্লা ফতে। ব্লগের ছোঁয়া পেয়েই ভাবলাম প্রথমেই এই অভিজ্ঞতাটাকেই লিখে ফেলি। তারপর দেখবো পোস্ট করা যায় কি না। এভাবেই এই দুঃসহ বেলায় আজ সচলায়তনে ঢুকলাম আমি।
সচলের এই দুর্দিন মানে আমাদের সবার দুর্দিন। যারা সচলে লিখি, যারা সচল পড়ি, এবং যারা সচলকে ভালোবেসে মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করি। আর শুধু সচল বললেও ভুল হবে। এটা যে কোন ব্লগ বা ওয়েবের জন্যেই হতে পারে। পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে নিজেকে কি নিরাপদ ভাবা চলে ? অতএব যে যেখানেই থাকি না কেন কেউ আর আজ নিরাপদ ভাবি কী করে ? সচল যে আসলেই কিছু একটা করতে পারছে, শুধু শুধু ব্লগরব্লগর করছে না, আজ তাই প্রমাণ হলো। তাই সচল সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমার অভিনন্দন জানাচ্ছি। এর পর জানি না আবারো সচলে ঢুকতে পারবো কি না। তাই সবাইকে আমার আন্তরিক শুভ কামনাটুকু জানিয়ে রাখলাম। যদি ঢুকতে না-ও পারি. তবু সব সচল ভাইয়েরা এটুকু অন্তত জানবেন যে আমি আপনাদের সাথে আছি, এবং থাকবোও। অশুভ অন্ধকারের সাথে কোন আপোষ নেই। তা হতে পারে না। সবাই ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

(নোট: আসলে বুঝতেই পারছি না যে, লেখাটা সচলায়তনে আদৌ পোস্ট হলো কি না। সচলের কোন এপারেটাসই কাজ করছে কি করছে না, সেটাই বুঝা যাচ্ছে না। কিন্তু নিজেকে প্রকাশ না করেও যে শান্তি পাচ্ছি না ! কী আর করা, সময়ের কাছেই পোস্টটা ছেড়ে দিলাম তবু।)
(R_d_B)
(amarblog)

Sunday, July 13, 2008

# যে বলে ভুত নেই, সে মিথ্যে বলে...









যে বলে ভুত নেই, সে মিথ্যে বলে
-রণদীপম বসু


কৈশোরে ভুতের বিশ্বাস প্রবল ছিলো, না কি বিশ্বাসের সারল্যে ভুতের আছরটাই তীব্র ছিলো তা বলতে পারবো না। তবে সুনসান দুপুরে বা ভর সন্ধ্যায় হাছন নগর পয়েণ্টের কোণাটায় সতীশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের গাছপালাময় নির্জন ছায়াচ্ছন্ন এলাকাটা নির্বিবাদে পার হয়ে যাওয়া যে কত দুঃসাধ্য ছিলো, তা কি বলতে হয় ? তা ছাড়া দিনটা যদি শনি-মঙ্গলবার হয় তাইলে তো কথাই নেই। দৈবক্রমে বেঁচে-বর্তে ফিরে আসাটাও যে কী সৌভাগ্য আর অসম্ভব বীরত্বের ব্যাপার ছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গার্লস স্কুলের লাগোয়া পেছনটায় সাক্ষাৎ অমঙ্গলের প্রতীক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা দু’মাথাঅলা বিশাল তালগাছটার চূঁড়ায় স্থায়ীভাবে ঠাঁই নেয়া রোমহর্ষক ভূত-পরিবারের অশরীরী শক্তির কাছে অসহায় মানুষের লৌকিক অস্ত্র-শস্ত্র অহেতুক অকার্যকরই শুধু নয়, হাস্যকরও, তা একটা গাধাও জানতো। কিশোর বয়সের ইচ্ছে-স্বাধীন চলাফেরার মাঝখানে জলজ্যান্ত একটা প্রতিবন্ধকতা এতোবড়ো হুমকী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এমোন অশরীরী শক্তির বিরুদ্ধে নিরাপত্তার তাগিদে অলৌকিক অস্ত্র না হলে কি চলে ! কিন্তু সে অস্ত্র পাই কোথায় ? অবশেষে তারও সন্ধান পাওয়া গেলো। পাড়ার দাদী সম্পর্কের চলচ্ছক্তিহীন থুত্থুড়ে জ্ঞানদা ওরফে জ্ঞানী বুড়ি আমাদেরকে তাঁর বহু বাঘা বাঘা ভূত কাবু করার পূর্বেতিহাস বয়ান শেষে একান্ত দয়াপরবশ হয়ে সেই অলৌকিক অস্ত্রের অব্যর্থ সন্ধান দিলেন। অস্ত্র যে ব্যর্থ ছিলো না, একেবারে অব্যর্থ, তা আর প্রমাণের অপেক্ষায় থাকলো না। দাঁত মুখ খিচড়ে ড্যাবড্যাবে চোখ বুঁদে দম আটকে ভোঁ দৌঁড়ের মধ্যে সেই অলৌকিক অস্ত্রের সশব্দ ব্যবহার করতে করতে যখন এলাকা পার হয়ে হাঁফাতে থাকতাম, স্বস্তি ফিরেই নিজকে জীবিত আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে অস্ত্রের অব্যর্থতার সাথে ভূতের বিশ্বাসটাও ক্রমে ক্রমে জোরালো হয়ে ওঠলো।

বেঁচে থাকলে লেখাপড়ার জন্য বহু সময় সুযোগ পাওয়া যাবে। আগে তো জীবনের নিরাপত্তা দরকার ! তাই ভূতের অত্যাচার প্রতিরোধক অস্ত্র হিসেবে দাদীর দেয়া মন্ত্রটাকে সঙ্গি সাথিসহ আমরা সবাই এমনভাবে টুটস্থ করে নিয়েছিলাম যে, কী জানি মন্ত্রের উচ্চারণে সামান্যতম ভুল থেকে যাওয়ার হঠকারিতায় শেষ পর্যন্ত মন্ত্রটাই অকার্যকর হয়ে যায় ! সে ব্যাপারে অত্যন্ত মনোযোগী ছিলাম। ‘ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি/ রাম লক্ষণ বুকে আছে, করবে আমায় কী !’ এই মন্ত্রের গুণাগুণ যে কতো তীব্র, পরবর্তীকালেও তা হরহামেশা অনেকের মুখেই অসম্ভব অবিশ্বাস্য কথার প্রেক্ষিতে ‘ভূতের মুখে রাম নাম’ শীর্ষক উক্তির বহুল বর্ষণে বারবার প্রমাণিত হয়েছে এবং আজও হচ্ছে। অর্থাৎ রামের নাম শুনলে যে ভূত শব্দকম্পিত এলাকা ছেড়ে প্রাণ নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়, তার মুখেই রাম নাম শোনা অসম্ভব বৈ কি।

সে যাক্, এভাবেই ভূতের বিরুদ্ধ-অবস্থানে থেকে গোটা কৈশোরটা কেটে গেলো একদিন। ভূতটা হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রয়ে গেলো আরো কিছুকাল সেখানে। আমিই উচ্চতর শিক্ষার জন্য এলাকা ছেড়ে ভূতের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। আর অনেক অর্থহীন অবিশ্বাসের সাথে সাথে ভূতের অস্তিত্বেও অবিশ্বাসী হয়ে ওঠলাম। এভাবেই যৌবনের স্বর্ণালী সময়টুকু পার করতে করতে আবার একটু একটু করে আত্মগত হতে লাগলাম, যে সরিষা দিয়ে ভূত তাড়ানোর তরিকা আবিস্কৃত হয়েছিলো, সেই সরিষাতেই শেষ পর্যন্ত ভূতের অস্তিত্ব থেকে যায়। অর্থাৎ ভূতের অস্তিত্বে আমার এতোকালের অবিশ্বাস ভুল ! দীর্ঘ আড়াই যুগ অতিক্রান্ত হয়ে ফের আমি ভূতের অস্তিত্বে প্রবল বিশ্বাসী এখোন !

এটা আমার কোন কৌতুক নয়। এখন আর আমি কোন কৌতুক করছি না। অত্যন্ত সিরিয়াসলি বলছি, যে বলে ভূত নেই, সে মিথ্যে বলে ! এই তো ক’দিন আগে আমাদের মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা তাঁর প্রবীনত্ব ডিঙ্গিয়ে যদি বলতে পারেন- শায়েস্তা খাঁ’র আমল আর নেই। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমার আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম কমার বিষয়টি চিন্তা করাটাও অবাস্তব। ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা না করলে বাজার পরিস্থিতি সহনীয় রাখা সম্ভব নয়। তাহলে নিত্যনৈমিত্তিক ছিনতাই খুন রাহাজানি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সামনে রেখে যদি একদিন হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভৌতিক বাণী শুনি আমরা- ‘ ......এর আমল আর নেই, দেশে হত্যা খুন ছিনতাই রাহাজানি কমার আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে হত্যা খুনের প্রাবল্য কমার বিষয়টি চিন্তা করাটাও অবাস্তব। সন্ত্রাসীরা সহযোগিতা না করলে দেশের সন্ত্রাসী পরিস্থিতি সহনীয় রাখা সম্ভব নয়।’ তা কি খুব বেশি আশ্চর্যের হবে ? রাষ্ট্রের কর্ণধারদের মুখে এমন উক্তি শোনা এর আগ পর্যন্ত আমার ধারণায় ভৌতিকভাবেই সম্ভব ছিলো। আর তা যে এখন আর ভৌতিক বা অসম্ভব কিছু নয় এর সর্বশেষ প্রমাণ নিশ্চয়ই দেশবাসী ইতোমধ্যে আজই পেয়ে গেছেন, এবং শরীরে চিমটি কেটে যাচাই করে নিচ্ছেন হয়তো, এটাও কি সম্ভব ! ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সব পত্রিকার হেডিং আজ (১২ জুলাই ২০০৮) - ‘জামায়াতের মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের সম্মেলনে মুত্তিযোদ্ধা লাঞ্চিত !’

জামাতের মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ ! ভুতের সাথে রামের এতোই গলাগলি সম্পর্ক হয়ে গেলো ! যারা যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাইবার অপরাধে এক প্রবীন মুক্তিযোদ্ধাকে পদাঘাত করতে করতে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দিয়েছে ! তিনি লাঞ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর অসমাপ্ত বক্তব্যে বলে যাচ্ছিলেন-‘ জামায়াতের এ সমস্ত নেতারা পিস কমিটির (শান্তি কমিটি) সদস্য ছিল। যারা রাজাকার আলবদর ছিল তারা গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ করেছে। এখনই তাদের বিচার করতে হবে। আমার বিবেচনায়, তাদের এখনই ফাঁসি দিতে হবে।’

তার বক্তব্য শেষ হয়নি। সাংবাদিকরা তার নামটিও জানার সুযোগ পাননি। এর আগেই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে থেকে বর্ষীয়ান এ মুক্তিযোদ্ধাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। একজন তাঁর পিঠে লাথি বসিয়ে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা, সেক্টর কমাণ্ডারদের নিয়ে কটাক্ষ করা এই জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের প্রতিনিধি সম্মেলনে (১১ জুলাই ২০০৮, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন) প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জেআর মোদাচ্ছির হোসেন। আর যাঁরা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান, বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান, উইং কমাণ্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খান, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক রেজোয়ান সিদ্দিকী, নিউ নেশনের সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন গাজী, সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর প্রমুখ।

মুক্তিযুদ্ধে মা, ভাই ও বোন হারানো এই চিতাগ্নি বুক নিয়েও আজ লজ্জায় অপমানে মাথা হেট করে কোথায় দাঁড়াবো ? এই রক্তস্নাত মাটিতে কি আর একটাও মানুষ নেই ? সব জীবন্ত মৃতদেহ !

এই দেশে যদি জামাতের মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ হতে পারে, তবে, যে বলে ভূত নেই, সে শুধু মিথ্যুকই নয়, আত্মপ্রতারকও !
(১২/০৭/২০০৮)
(R_d_B)
(Sa7rong)
(Pechali)
(amarblog)
(somewhereinblog)

Friday, July 11, 2008

# বাংলাদেশ কি ধনীদের দেশে পরিণত হচ্ছে ?







বাংলাদেশ কি ধনীদের দেশে পরিণত হচ্ছে ?
-রণদীপম বসু


চলতে চলতে হঠাৎ করেই সামনেরটিকে ধাক্কা মেরে বসলো আমাদের রিক্সাটা। যাত্রীর গুঞ্জন ছাপিয়ে সামনের চালক খেঁকিয়ে ওঠলো- অই হালার পো, আন্ধা নি ? চউক্ষে দেহছ না ?
রীতিমতো মারমুখি ব্যাপার। অথচ প্রতি উত্তর শুনে আমাদের চালকটিকে বেশ রসিকই মনে হলো- আবে হালায় ডাকাইত নি ! তুই এহনো চউক্ষে আন্ধাইর দেহস নাই ! হালায় জমিদারের নাতি হইছ তো রিক্সা ঠাপাইতে আইছস কেন্ বে ?
দূর হালার পো হালা। বলেই আগের চালক সামনে চলতে শুরু করলো। হয়তো আরো কিছুটা বাগড়াবাগড়ি চলতো। কিন্তু রাস্তার জ্যাম মুক্ত হওয়ায় যে যার পথে ছুটলো আবার।

ঢাকার রিক্সায় চড়েছেন অথচ রিক্সায় রিক্সায় ঠেলাগুঁতো বা চালকদের মধ্যে ঝক্কিফ্যাসাদ দেখেন নি এমন কেউ কি আছেন ? আমার জন্যে তো তা নিত্য নৈমিত্তিক অভিজ্ঞতাই। কিন্তু আজকের বিষয়টাকে কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম বা আনকোড়াই মনে হলো। কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে চালককে জিজ্ঞেস করলাম, বাড়ি কই আপনার ?
জী, আছিলো তো বরিশাল।
বরিশালের লোকেরা মনে হয় রসিক হয় খুব, তাই না ?
রস দেখলেন কই স্যার ! আমাগো জান বাইরয়, আর আপনে দেখতে আছেন রস ?
কেন, আপনাদের কথা চালাচালি শুনে আমার তো তাই মনে হলো !
ঘর্মাক্ত সচল শরীর দুমড়ে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পেলাম যেনো। হঠাৎ তাঁর কথার মধ্যে কটাক্ষের ছোঁয়া পাচ্ছি। হ, গরীবের কি আর ভাত খাওনের জোগার রাখছেন আপনেরা ? কথা দিয়াই তো আমাগোরে পেট ভরতে অয়।
হুম, ঠিকই বলেছেন। গরীবের বাঁচার আর কোন রাস্তাই নাই।
ফজরে ঘুম তনে উইঠ্যা দোকানে যাইয়া হুনি চাইলের দাম আবার বাড়ছে। কাইল আপনেগো উপদেষ্টা সাবে কী জানি কইছে রাইত, সকাইল্যা বেলাই সয়াবিনের দাম বাইড়া গেছে পনরো টেকা। আরে হালার দোকানে তেলই নাই। রাইতের বেলাই ফিনিশ ! সব মাগীর পুতেরাই এক রকম। গরীব হালার পুত হালায় একটায়ও বাঁচবো না আর। সব হালারা মরবো।...
কথা তো না, যেনো মাংস পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে ! আগের রাতে আমাদের অর্থ উপদেষ্টা মহোদয় সংবাদকর্মীদের কাছে ‘এটা শায়েস্তা খাঁ’র আমল না, দ্রব্যমূল্য কমার কোন সম্ভাবনা নেই ; এখানে সরকারেরও কিচ্ছু করার নেই’ বলে যে ঐতিহাসিক বাণী ছেড়েছেন, এর কয়েক ঘণ্টা পরই অস্থির বাজার পরিস্থিতি আর খেটে খাওয়া দিনজীবী মানুষগুলোর বেঁচে থাকার নাভিশ্বাস অবস্থার অতি ক্ষুদ্র এক টুকরো প্রতিফলন ভাসছে এই রিক্সাচালকের উক্তিতে।
আগে রিস্কার মালিককে আধা বেলায় দিতে হইতো পঞ্চাশ টেকা। এখন দিতে অয় নব্বই টেকা। বস্তির ভাড়া বাড়াইছে পাসশো টেকা। আপনেরা তো স্যার ভাড়া দুই টেকা বেশি চাইলেই সোজা হাঁটা শুরু কইরা দেন !
আমি বললাম, দেখেন ভাই, আপনার জন্য যেমন সব বাড়ছে, আমার জন্যেও তো বাড়ছে সব। ছোটখাট চাকরি করি। সব কিছুর দামই সরকার ক’দিন পর পর বাড়াচ্ছে। কিন্তু আমাদের বেতন তো একটাকাও বাড়ায় নাই ! আমি কার কাছে বলবো এসব ? আমার জন্যে তো রিক্সা চড়াটাই এখন বিলাসিতা !
তয় আমরা যামু কই ? দেইখেন গরীব হালার পুত হালারা একটাও বাচবো না ! মইরা সাফ হইয়া যাইবো সব।

কথোপকথনের সংবেদনশীলতায় পারতপক্ষে খুব একটা যেতে চাই না আমি। মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক যন্ত্রণাকে ঘাটানো বিপজ্জনকও। কষ্টের আগ্নেয়গিরিতে খোঁচা খেলে মানুষের আবেগ অস্থির হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই কোন বাধা মানে না আর। কিন্তু দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক পরিস্থিতিতে সব কিছুই যেভাবে উদ্ভটতায় আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে করে সবাই নিজ নিজ ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতায় ভুগছে, সব কিছুই একাকার হয়ে কেমন একটা গুবলেট অবস্থায় দাঁড়াচ্ছে যেনো। তাই আমাদের কথোপকথনের পরিবেশটাকে সিরিয়াসনেস থেকে ঘুরিয়ে হালকা করার জন্য হঠাৎ করেই কৌতুকের আশ্রয় নিলাম। আমাকে বহনকারী রিক্সার চালকের শেষ উক্তির রেশ ধরেই বললাম- আপনি ঠিক বলছেন তো, গরীব সব মরে সাফ হয়ে যাবে ?
হ, গরীবের গুয়ায় যেই বাঁশ ঢুকাইবার লাগছেন, এক হালায়ও কি বাঁচবো আর ? সব শেষ।
তাহলে তো আমাদের এই দেশের জন্য বিশাল সুখবর এটা !
কোন প্রত্যোত্তর না পেলেও আমার এমন কথায় তাঁর জেগে ওঠা কৌতুহল টের পেলাম ঠিকই। আমি বলে চললাম, আপনার কোন আত্মীয় বা পরিচিত কেউ বিদেশে থাকে ?
আত্মীয় নাই। তয় পরিচিত আছে অনেকেই।
দেশের বাইরে বিদেশে বাংলাদেশের পরিচয় কী রকম, আপনি জানেন ?
মাথা নেড়ে তার অজ্ঞানতা প্রকাশ করলো।
বিদেশে বাংলাদেশের পরিচয় হচ্ছে ফকির মিসকিনের দেশ, এইটা তো শুনেছেন ?
হ।
এই সুযোগে আপনার কথা অনুযায়ী যদি দেশের সব গরীব মইরা যায়, তাইলে বাঁইচা থাকবে কারা, বলেন তো ?
বড়লোকেরা !
হ্যাঁ, তখন কেবল ধনীরাই থাকবে বাংলাদেশে ! কোন গরীব নাই ! বিশ্বে আর একটা দেশও কি পাবেন যেখানে কোন গরীব নাই ? তাহলে তখন বাংলাদেশের পরিচয় কি আর ফকির মিসকিনের হবে ? এটা তখন ধনীর দেশ হয়ে যাবে !
হ, ঠিকই কইছেন।
তাহলে সরকার কেন এই সুযোগ হাতছাড়া করবে ? কোন সরকার যা পারে নাই, এই সরকার তা করে দেখিয়ে দেবে ! বাংলাদেশ ধনীদের দেশ ! অতএব যত তারাতারি মইরা যাইতে পারেন ততই দেশের জন্য মঙ্গল। যারা এইটা বুইঝাও এখনো মরতেছে না, তাগরে মারনের একটা বুদ্ধি বের করতে হবে না !
তার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ানো দেখেই বুঝলাম কথাটা বোধ হয় বেচারার মনে ধরেছে।

বাসার সামনে এসে ভাড়া দু’টাকা বাড়তি দিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললাম, আমার কথায় কিছু মনে করবেন না ভাই। আপনার কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু আমাদের কষ্ট কেউ বুঝে না।
ভাড়া গুনে হঠাৎ বাড়তি টাকা দুটো ফেরৎ বাড়িয়ে বললো, নেন স্যার। এই টাকা নিমু না আমি।
কেন ?
আপনিও আমাগোর মতোই।
আমি ফেল ফেল করে চেয়ে রইলাম। দেশটা যদি সত্যি সত্যি ধনীদের হয়ে যায়, এই সহানুভূতিটুকু কি থাকবে তখন ?
(১১/০৭/২০০৮)
(R_d_B)

Wednesday, July 9, 2008

# বিয়ে, সংশোধনের অযোগ্য যে ভুল !...(রম্যরচনা)






বিয়ে, সংশোধনের অযোগ্য যে ভুল !
-রণদীপম বসু


বিয়ে করার আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে হাঁদারাম আমি তখনও বুঝিনি, কী ভয়ঙ্কর অপরিণামদর্শি ভুলের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি। চল্লিশ পেরিয়েও অকৃতদার পাড়াতো ভাই অরুনদা’র বিজ্ঞজনোচিত পরামর্শকে ‘দিল্লীকা লাড্ডু জো ভি নেহি খায়া, সো ভি পস্তায়া’ ভেবে নিজকে কী হতে যে কী ভেবে বসেছিলাম, তা আর নাই বললাম। দক্ষিণ পাড়ার দিগম্বর দাদু, যাকে দুই পয়সার পাত্তা দিতেও আজ পর্যন্ত কাউকে দেখি নি, আমাকে ভালোবাসেন বলেই হয়তো নির্বুদ্ধি ভেবে খুব করে বলে দিয়েছিলেন, দেখো হে, হটকারী একটা সিদ্ধান্তই যথেষ্ট, পুরুষ মানুষের সটান উল্লম্ব সিনা চোখের পলকেই ভূমির সমান্তরালে বেঁকে সোজা হওয়ার সমস্ত ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে। কণ্ঠে যে বাঘের হুঙ্কার গর্জে ওঠতো, ওটা আর কখনোই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করার সীমানা ছেড়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। অতএব এতো তড়িঘড়ি না করে বাপু মাথার বায়ু নামিয়ে ফেলো। মস্তিষ্কে বায়ু চড়ে গেলে বুদ্ধি নাকি হাঁটুতে নেমে আসে। আমার বুদ্ধিবৃত্তিও যে হঠাৎ করে হাঁটু থেকেও বিপজ্জনক নীচে নেমে গেছে, এ বিষয়ে তাঁর কোন সন্দেহ নেই। আমি আর কী বলবো ! সত্যি সত্যি আমি তখন কল্পনার চিত্রল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। যেদিকেই চাই, হতে যাওয়া তুমি আর তুমি শুধু।

তবু আমার ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মতিগতি খুব একটা সুবিধের নয় আঁচ করেই হয়তো পক্ষকালের হাজতবাস অভিজ্ঞ আমাদের সবার মতি ভাই আমাকে সার্বক্ষণিক সাহস যুগিয়ে যেতে লাগলেন, আরে মিয়া পুরুষ হইছো আর মাইয়া মানুষের গন্ধ নিবা না এইটা কী করে হয় ! তুমি মিয়া ঐ শালাগো কারো কথাই শুইনো না। হেগোর মেরুদণ্ড আছে নাকি ! একে তো নাচনে বুড়ি, তার উপর ঢোলের বাড়ি। আমাকে আর পায় কে। কি জানি উদ্যমে ভাটা দিয়ে বসে, তাই লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে সর্বশক্তি দিয়ে তটস্ত করে তুললাম মুরুব্বিদেরকে, যারা সম্মন্ধসূত্র গড়ে দেয়ার মহান ব্রত নিয়ে চিরকালই নিজেদের বিলীন করে দিয়ে আসছেন বলে সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। অতএব যা হবার তাই হলো। কোন এক শুভলগ্ন (?) বেছে শেষ পর্যন্ত ওয়ান ওয়ে রোডে বিয়েটা করেই ফেললাম।

আহারে ! আমার মতো কেউ কি এখন হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছেন, দুপেয়ে একটা বীর পুরুষপুঙ্গব বিয়ে নামক সংশোধনের অযোগ্য এক বালখিল্য ঘটনার শিকার হয়ে চোক্ষের সামনে কী করে ধোপী-গাধার মতো চতুষ্পদী একটা প্রাণীতে পরিণত হয়ে যায় ! প্রবল মাধ্যাকর্ষণ উপেক্ষা করা টানটান সিনা তার কীভাবে ভারবাহী চতুষ্পদী স্বভাবে নুয়ে পড়ে ভূমির সমান্তরালে ক্রমশই নিকটবর্তী হতে হতে শেষপর্যন্ত অদ্ভুত মাটি-লগ্নতায় পেয়ে বসে তাকে ! বার্ষিকীপূর্ণ হতে না হতেই ষড়পদ ধারণ করে দর্পাহত বুকটা তার মাটি ঘষটাতে শুরু করে দেয় ! আর পরাক্রমশীলতায় যিনি যতো অহঙ্কারী ছিলেন বলে শুনা যায়, তার নাকি পদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে বাড়তে বাড়তে পদহীন কেঁচোর মতোই......শেষপর্যন্ত গড়াতে গড়াতে মাটিই পরম আশ্রয় হয়ে যায় !

আহা, তবে কি জীবনটাই মাটি ! কেউ কি জানেন, গাধারাই বিয়ে করে, না কি বিয়ে করেই গাধা হতে হয় !
(০৮/০৭/২০০৮)
(R_d_B)
[pechali]
[somewhereinblog]
[amarblog]
[sa7rong]

Monday, July 7, 2008

# ‘ইহা শায়েস্তা খাঁ’র আমল নহে’







‘ইহা শায়েস্তা খাঁ’র আমল নহে’
-রণদীপম বসু


গতকল্য ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে আকস্মিক এক মহতি বাণী শ্রবণ করিবার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াও নিজেকে বুঝাইতে পারিতেছিলাম না, ইহা কী শুনিলাম। আর অদ্য প্রিণ্ট মিডিয়ার কল্যাণে উহা পর্যবেক্ষণ করিয়া চক্ষু কর্ণের বিবাদভঞ্জন করিবার সুযোগপ্রাপ্ত হইয়া নিশ্চিন্ত হইলাম যে, এই কর্ণকুহরে যাহা প্রবিষ্ট হইয়াছিল গতরাত্রিতে, কদাচ মিথ্যা ছিল না তাহা ; বিলক্ষণ সত্যই শুনিয়াছিলাম।

যাহা শুনিয়াছিলাম তাহার মর্মার্থ নিম্নরূপ। আমাদের মহামহীম অর্থ উপদেষ্টা ড.এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মহোদয় তাহার মধুমুখনিঃসৃত এক অমেয় বাণীর মাধ্যমে আমাদিগের মতো বুদ্ধিভ্রংশ অপগণ্ড নাগরিকদিগকে ইতিহাসের শায়েস্তা খাঁ’র আমলের কথা ভুলিয়া যাইবার অভূতপূর্ব সত্যপরামর্শ দিলেন তো বটেই, দ্রব্যমূল্য যখন নাগালের উর্ধ্বে উঠিয়া নভোমণ্ডলে উড়িয়া চলিবার মুক্ত প্রতিযোগিতায় ভীষণ পাগলাটে হইয়া সব কিছুকে তুচ্ছ করিয়া দিয়া অশিক্ষিত মুর্খ জনতার কল্পনাকেও হার মানাইয়া ফেলিতেছে, তৎক্ষণাৎ তিনি অতিশয় জোর দিয়া ইহাও বলিয়াছেন যে, নিত্যপণ্য দ্রব্যাদির যদৃচ্ছ খরিদমূল্য কমিবার আপাতত কোনই সম্ভাবনা নাই। মূল্যহ্রাস ঘটিতে পারে, আমাদিগের এহেন দুর্মর আশা সম্পূর্ণরূপেই অবাস্তব এবং কাল্পনিকচিন্তা মাত্র। এবং ইহা বলিতেও তিনি কিয়ৎমাত্র ভুল করিলেন না যে, এতদবিষয়ে সমাসীন সরকার বাহাদুরের কিছুই করণীয় নাই। আহা, আমাদের রাজাধিরাজ, পাত্র মিত্র অমাত্যবৃন্দের প্রজাবাৎল্যর কী অপার মহিমা ! ধন্য আমাদের অকল্পনীয় সৌভাগ্যকে।

তিক্তবচন যতই দুর্বার সত্য হউক না কেন, তাহা স্পষ্টরূপে উদগীরণের এইরূপ অদৃষ্টপূর্ব ক্ষমতা সকলের থাকে না। ইহার জন্য বুকে বল আর বিচিত্র মানবশরীরের কটিদেশে যে শক্তিসামর্থ থাকিতে হয় তাহা যে আমাদের এই মহান বাণীদাতার বিলক্ষণ রহিয়াছে, ইহা ভাবিয়া বিনয়াবনত প্রজা হিসাবে অতিশয় তৃপ্তির উদয় হইল। কৃতদাস্য করিয়া করিয়া এই অভাগা জাতির বাঁকিয়া যাওয়া মেরুদণ্ড যখন সোজা সরল হইবার আর কোন সম্ভাবনা দেখিতে পাইতেছিলাম না, এতদলগ্নে তাঁহার এতদৃশ পরম সাহসী বাণী আমার মতো অভাজনকেও অতিশয় আশ্বস্ত করিয়াছে বৈ কি। না, আশাহত হইবার কোন কারণ নাই। এখনও আমাদিগের সূর্যসন্তানরা নিঃশেষ হইয়া যায় নাই।

নির্বুদ্ধিতায় আক্রান্ত হইলে মানুষ ইতিহাস বিস্মৃত হইয়া যায়। আমরাও ইতিহাস বিস্মৃত হইয়াছিলাম। কিন্তু ইতিহাসের এই খণ্ডিত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ যে বাহুল্যস্বরূপ মনের মধ্যে ঘুপটি মারিয়া থাকিয়া সরিষার ভুতের মতো আমাদিগকে কোন্ অজান্তে বিপথে চালিত করিবার প্রয়াস পাইয়াছিল, আমরা তাহা বুঝিতে না পারিলেও তিনি তাহা ঠিকই অনুধাবন করিতে পারিয়াছেন। এইখানেই পরম জ্ঞানীজনের সহিত অতিসাধারণ জনতার অনতিক্রম্য ব্যবধান রচিত হইয়া যায়। আমরা টু শব্দটি করিবার পূর্বেই দিব্যচোখে তিনি তাহা অবলোকন করিয়া ভাবের সারমর্ম উচ্চারণ করিয়া বুঝাইয়া দিলেন, তোমাদের চিন্তাধারা সঠিক রাস্তায় চালিত হইতেছে না। ওইসব অনর্থক অষ্টবক্র চিন্তা পরিহার কর। নচেৎ মন্দ ফলাফলের জন্য নিজেরাই দায়ী হইয়া যাইবে। দৈবাৎ না খাইয়া মরিয়া যাইবে ? ইহা ভিন্নতর বিষয়। পরবর্তীতে সুযোগমত তাহা লইয়া ভাবা যাইবে না হয়। কিন্তু বাঙালীর পরাণ তো এতো ভঙ্গুর নহে। ইহা কৈ মাছের ন্যায়। ইহাকে তাড়াইতে চাহিলেও তাহা সহজে ছাড়িয়া যাইবে না। অতএব এই বাহুল্য প্রাণবায়ু লইয়া দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইবার তো কোনই হেতু দেখি না !

শুনিয়াছি নবাব শায়েস্তা খাঁ’র অতিবিশ্রুত আমলে এক টাকার বিনিময়মূল্যে আটমণ ওজনের সমপরিমাণ চাউল খরিদ করা যাইত। অতিউর্বর সেইসব আমলে শস্যপ্রসবিনী দেশমাতৃকার জীবিত সন্তানদের মধ্যে ক্ষুৎপীড়িত হইয়া কেহ স্বর্গলাভ করিয়াছে এইরকম অকল্যাণমূলক দৃষ্টান্তও কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। অধিকন্তু তাহারা যে অতীব সুখ শান্তিতেই দিনাতিপাত করিয়া গিয়াছে ইহাই সর্বত্র বিশ্রুত আছে। ইহাতে ধারণা হইতেছে যে, তখনকার অধিবাসীদিগের দৈনন্দিন রাহা খরচসহ আনুষঙ্গিক আয়-উপার্জন অতিবিলাসী না হইলেও কোনভাবেই অকিঞ্চিৎকর ছিলো না। কেননা তৎকালীন ইতিহাসের খানাখন্দ খুঁজিয়াও সেই আমলের অকিঞ্চিৎ উপার্জনের এইরকম কোন নমূনা আজপর্যন্ত কেহ দাখিল করিয়াছেন বলিয়া শুনিতে পাই নাই।

এমতাবস্থায় মহামহিম উপদেষ্টার দীপ্যমান স্বতঃস্ফূর্ততার উজ্জ্বল পরামর্শবাণী মোতাবেক আমরাও ইতিহাসের পরিত্যাজ্য কণাসদৃশ বাহুল্যটুকু ভুলিয়া যাইতে চাই। ইহা শায়েস্তা খাঁ’র আমল নহে। তথাপি অতীব নগন্য যে কারণটির জন্য উহা ভুলিতে পারিতেছি না, তাহাই সুচাগ্র আলপিনের তীক্ষ্ণ শূলের মতো নিরবচ্ছিন্ন খুঁচাইয়া খুঁচাইয়া পুনঃ পুনঃ মনে করাইয়া দিতে উদ্যত থাকিতেছে। সরকার বাহাদুরের নকড়ান্ন খাইয়া দিনাতিপাত করিবার সজোর প্রচেষ্টায় যাহারা কেবলমাত্র বাঁচিয়া থাকিবার প্রাণপণ চেষ্টায় লিপ্ত রহিয়াছে, তাহাদের দৈনিক কিংবা মাস মাহিনাটা যে শায়েস্তা খাঁ’র আমলের অপভ্রংশ স্মৃতিটাকেই ধারণ করিয়া বহাল তবিয়তে প্রাণবায়ুতে ধুম্র উদগীরণ করিয়া যাইতেছে, তাহা মহামান্য উপদেষ্টা মহোদয় তাঁহার প্রবল আত্মশক্তিতে ভুলিয়া যাইতে সক্ষম হইলেও মূর্খ অভাজনরা সেই অলৌকিক গুন সঞ্চয় করিতে পারিবেন কী করিয়া ? তাহারা তো ভাতের চিন্তা করিতে করিতে যাবতীয় সৃজন উন্মুখ চিন্তার প্রক্রিয়াই ভুলিয়া গিয়াছে ! আর রাষ্ট্রচিন্তার মর্মার্থ বুঝিলে তো এই বঙালদেশ কোন্ কালেই জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ হইয়া সবাইকে তাড়াইয়া বেড়াইত। সে যাহাই হউক, তথাপি প্রজা বলিয়া কথা। কখন কী করিয়া বসে তাহার কি কোনো ঠিক ঠিকানা আছে !

কখন আবার ধুম্রের আঁচ পাইয়া চামড়া জ্বলিয়া উঠিলে শায়েস্তা খাঁ’র নাম উল্লেখ করিয়া মূর্খ জনতা অহেতুক বেয়াদপি করিয়া বসে, সেই বিষয়টাও কি আমাদের মহামহিম উপদেষ্টা মহোদয় তাঁহার ত্রিকালদর্শী দিব্যচোখে অবলোকন করিতে পারিতেছেন ? শুনিয়াছি রাবণেরা যেইখানেই যায়, সেইটাই নাকি লঙ্কা হইয়া যায় !

(০৬/০৭/২০০৮)
(R_d_B)
(R_d_B)
(R_d_B)
(Sa7rong)

Thursday, July 3, 2008

# অদৃশ্য বাতিঘর-০৭ (কবিতাগুচ্ছ)








অদৃশ্য বাতিঘর-০৭ (কবিতাগুচ্ছ)
- রণদীপম বসু



যে গল্প গল্প নয়

যেখানে মেঘ সেখানে বৃষ্টি, এটা তো ভাদ্রের গল্প ;
এরকম আরো কতো গল্প আছে
আশ্বিন থেকে শ্রাবণ অবধি।
আমি তো এসেছি বনকৈশোর থেকে ঋতুপর্ণ যৌবন নিয়ে
তোমার কাছে,
তোমার গল্প শুনবো বলে..।

থামতে জানে না বলে ঘর নেই তার, এটা নদীর গল্প
হাঁটতে পারে না বলে স্বপ্নচারী ভীষণ, এটা বৃক্ষের গল্প
অথবা কষ্টেরা বড়ো বেশি আপন বলে
এতোটা বিশাল হয়ে ঝুলে থাকে জীবনের উপর,
এটা আকাশের গল্প।
এরকম আরো কতো কতো গল্প আছে
আগুনের পাহাড়ের মাটি আর পাথরের
সকালের বিকেলের অরণ্যের আঁধারের
দেখার গল্প শোনার গল্প দিকের গল্প দিশার গল্প
লক্ষ ফিকির বুকে নিয়ে মানুষগুলোর ভুলের গল্প
আরো কতো গল্প আছে !

আমি তো এসেছি তোমার কাছেই
সহস্র অযুত গল্পের নিভৃত ঠিকানা খুঁজে
গল্পহীনা তোমার কাছে
এক নতুন গল্প শুনবো বলে-
যে গল্প আর গল্প হবে না কখনো...।
(৩১/১০/২০০২)


নিশুতির পদাবলি

গলে গলে ঝরে পড়ে চাঁদ
গলে গলে ঝরে পড়ে চাঁদ
তারপর নিবিষ্ট আঁধার এলে বৃক্ষেরা জেগে ওঠে সব
চুপি চুপি গান গায় কথা কয়
প্রাচীন গল্পের গাঁথা বুনে বুনে
আমাকে পারায় ঘুম-
বলে আয় ঘুম আয় আয়...

আঁধার নিবিষ্ট হলে বৃক্ষেরা জাগে
আর ঘুমের ভেতরে জাগি অন্তহীন আমি এক..
চাঁদ গলে ব্যথা গলে তাবৎ ব্রহ্মাণ্ড গলে
গলে গলে ঝরে যায় সব !
আলো গলে অন্ধকার, গলে গলে একাকার,
গলে না কেবল এক
বুকের গভীরে খুব অর্থহীন বিষাদের ভার।
(২১/১২/২০০২)


প্রণয়ের আদিশ্লোক

ব্যাকরণ জানি না বলে
পারি না লিখতে কোনো প্রিয়ভাষী নাম
তবু ভাষিক দূরত্ব থেকে
আমার দেহের ভাষা সমস্ত ছাপিয়ে যদি
মিশে যায় কণ্ঠশীলা শরীরে তোমার
একে কী বলবে তুমি ?
প্রণয়ের আদিশ্লোক যে পারে খুঁজুক তা,
আমি তো শুদ্ধাচারী নই যে
বাঁধা পথেই যেতে হবে প্রলুব্ধ আমাকে !

ব্যাকরণ জানি না বলে
নাই বা পেলাম আদি-পথের দিশা,
অজ্ঞেয় পরিচয় বুকে তোমার মগ্নতায় নিমগ্ন আমি
মনে করো চন্দ্রাহত কোনো এক
পথহীন পথিক কেবল...।
(২৮/০২/১৯৯৯)


কৌমের শাসন ভেঙে

(১)
ঈভের পাপড়ির মতো ঝরে যাবে সুপর্ণ বাতাসে !
নীলকণ্ঠ কষ্ট ধুয়ে না পাও উষ্ণতা যদি
সাগরের গ্রন্থি খুলে মেখে নিও উৎকর্ণ আকাশের গায়
নিবিড় নিঃশ্বাসে ঝরে বয়ে যাবে আদি স্রোত
লেখা হবে প্রণয়ের অলিখিত উপাখ্যান যতো...।

(২)
কৌমের শাসন ভেঙে এ কোন্ গ্রন্থির মোহে
এসেছো শবরী কন্যা অশরীরী স্রোতে ?
পৃথিবী কৌমের ছায়া,
নিঃশেষে বিলীন হয়ে সব গ্রন্থি মিশে যাবে
আদি-অন্ত শরীরেরই ব্যুহে...।

(৩)
ফিরে যাও যাও কন্যা সেই সব মাটির পাঁজরে,
আপন দেহেতে লীন অভিন্ন উষ্ণতা বয়ে
এখনো যেখানে যতো প্রণয়ের কথামালা
চালাচালি হয়ে ফিরে
শব্দহীন শিকড়ে শিকড়ে...।


শিলালিপি

চোখের ভেতরে এক অনড় পাথর ধরে
আমাকেই বলছো তুমি- এই বুক কঠিন পাথর !
মানুষের অক্ষমতা এভাবেই ছুঁয়ে গেলে আঁধার-গভীরে আরো
এতোটা বিস্ময় কী করে লুকাই বলো ?
তার চেয়ে দৃষ্টির জলে কিছু ধুয়ে নিয়ে বিস্মৃতির ধুলো
পারবে কি চিনতে সেই স্থবির সময়,
যে আমার বুক নয়
আমৃত্যু গেঁথে যাওয়া কর্কশ অক্ষর হয়ে
বিপন্ন ফলকের মতো স্তব্ধ হয়ে আছে !

আশরীর হৃদয়ে ভরা মানুষ বৃক্ষ তো নয়
বেদনার টুপটাপ জমাট শিশিরে ভেজা
পাথরে হৃদয় ঘষে
তবু যদি বৃক্ষই বলতে তুমি
হয়তো বা হয়ে যেতাম বৃক্ষই শুধু ;
মানুষের শিলালিপি কখনো বুঝিনি বলে
অন্ধ দৃষ্টির ঘোরে পাথরের চেয়ে তুমি বেশি কিছু নও !

ভালোবাসা দূরে গেলে চলে যায় ঘৃণারাও পিছু ;
ভালোবাসা না-ই হোক
আজন্মের ঘৃণা সব পুনর্বার জেগে ওঠার আগেই
অবিনাশী হাত ছুঁয়ে বলতে তো পারতে শুধুই
মানুষে পাথরে থাকে কতোটা তফাৎ !
সে সব বলোনি কিছুই।
চোখের ভেতরে তোমার শুধু এক অনড় পাথর...।
(০৫/০৩/১৯৯৯)