Monday, March 3, 2008

# ‘আমাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ভানুমতির খেল’ (সমালোচনা সাহিত্য)


‘আমাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ভানুমতির খেল’


- রণদীপম বসু



পূর্বকথন বা ভণিতা

আমাদের সাহিত্যের বিচিত্র ভুবনটাতে শিশু বা কিশোর সাহিত্য হিসেবে দাবি করে যে ক্ষেত্রটা, এর মানসিক বোধনে যেহেতু স্বতঃসিদ্ধ কোনো বয়সসীমা এখনো বেঁধে দেয়া নেই তাই শিশু বা কিশোর-মনস্ক হলেই এ সাহিত্যটাকে আমরা শিশু বা কিশোর সাহিত্য বলে চালিয়ে নিতে পারি। যদিও এতেই সমস্যাটার সুরাহা হয় না, তবু সাবালক হয়ে ওঠার প্রচলিত বোধটাকে অতিক্রম না করে শিশু বা কিশোর মনের আশা আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন কল্পনা আনন্দ বেদনা ক্ষোভ হতাশা বা উচ্ছ্বাস এক কথায় তার মনোজগতের মায়াবী দোলাটাকে বহুবর্ণিল রেখার কল্প-আঁচড়ে সাবলীল এঁকে যাওয়াই এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হয়।

সাহিত্যের মূল স্রোতধারায় মানুষের গোটা জীবনটাই উপজীব্য হলেও বয়ঃসন্ধির অদ্ভুত ঘেরাটোপে আমাদের সাহিত্য শিশুসাহিত্যের ভিন্ন ভুবন নিয়ে দু’ফালা হয়ে আছে। বিশ্বসাহিত্যে এই স্বপ্নময় আগামী প্রজন্মের সাহিত্য-পরিচর্যা কিভাবে হয়ে থাকে তা নিয়ে আমাদের নমস্য প্রাজ্ঞজনেরা কিঞ্চিৎ আলোকপাত করতে পারেন। তবে আমাদের শিশুসাহিত্য যে কোন এক বিভেদের সু-উচ্চ পাঁচিল দিয়ে মূল স্রোত থেকে সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বেশ কিছুদিন যাবৎ এই শিশুসাহিত্যের বলয়ের মধ্যেও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়ে শিশু ও কিশোরের মাঝখানে আরেকটি স্বচ্ছ পর্দা নিরন্তর শৈল্পিক দোলায় আন্দোলিত হতে দেখা যাচ্ছে। এই যেমন কিশোর গল্প, কিশোর উপন্যাস, কিশোর কবিতা ইত্যাদি। তবে কিশোর সাহিত্য নামে স্বতন্ত্র কোনো সাহিত্যের জন্মচিৎকার এখনো কেউ স্বীকার করেন না বলেই মনে হয়। নইলে শিশুসাহিত্য পুরস্কারের পাশাপাশি কিশোর সাহিত্য পুরস্কার নামেও আরো কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য হয়তো বা চালু হয়ে যেতো এরই মধ্যে। এতে করে লাভ হতো এটাই যে, প্রকৃত শিশুতোষ সাহিত্যগুলোও লাইমলাইটে এসে পৃষ্ঠপোষকতা নামের অনুকম্পাটুকু অন্তত: পেতে পারতো। তা যে হবার নয়। কবিগুরুর চোখে কিশোর বয়সটার মতো জগতে এমন বালাই আর না থাকলে কী হবে, হালের কিশোর কবিতার জয়জয়কার কিন্তু থেমে নেই।

সম্প্রতি এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০০৭-এ এবার একই বিষয় ছড়া-কবিতায় দু-দু’টো বই একই সাথে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা (আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই) মুখে মুখে চাউর হয়ে যাওয়ায় কিশোর কবিতার শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে কারো মনে আর সন্দেহ থাকার কথা নয়; আমার তো নেই-ই। তবু দু’শ বছরের গোলামীর রক্তপরম্পরায় সন্দেহের বিষ যাবে কোথায়। আমিও যে এ বিষ থেকে মুক্ত নই, সহসাই টের পেলাম কৌতূহলটাকে নিবৃত্ত করতে পেরে না ওঠায়। সংগ্রহ করে নিলাম আলোচ্য বই দু’টো। সন্দেহের আরো একটা কারণ ছিলো, সে আলোচনায় পরে আসছি।


পুরস্কার কেন

পুরস্কার কি নতুন কিছু সৃষ্টি করে? এক কথায় উত্তর, না। তারপরেও কথা থাকে। পুরস্কার কিন্তু একটা বিষয় সৃষ্টি করে, আর তা হচ্ছে বিভেদ। চমকে যাবার মতো কথা নয় কি? না, চমকাবার কিছু নেই। সত্যিই তাই। পুরস্কার একটা বিভেদ সৃষ্টি করে- শ্রেষ্ঠ আর অ-শ্রেষ্ঠের বিভেদ। যারা ভালো সাঁতার জানেন তারাই সাঁতার প্রতিযোগিতায় নামেন শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। যিনি সাঁতার জানেন না তার তো স্বাভাবিকভাবেই এর ধারে-কাছেও আসার কথা নয়। তবে আসতে পারেন, সাঁতরাতে নয়, সাঁতার দেখতে আগ্রহী হলে। শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কে পড়লেন, তাকে দেখতে। প্রতিযোগী সাঁতারুর সামর্থ্য, শ্রমলব্ধ দক্ষতা আর মেধার মিশেলে সৃষ্ট নান্দনিক সাঁতার-শিল্প উপভোগ করতে; দেখে দেখে উৎফুল্ল হবেন, উচ্ছ্বসিত হবেন। শ্রেষ্ঠ যে হলেন- কেন হলেন তা বিচার বিশ্লেষণও করতে পারেন। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্ব নির্বাচন করবেন কে? এ জন্য সব প্রতিযোগিতায় বিজ্ঞ বিচারকের দায়িত্বে মনোনীত হন তারাই, যারা এই সংশ্লিষ্ট শিল্পের নাড়িনক্ষত্রের খোঁজ-খবর রাখেন, নিয়ম-কানুন কলাকৌশল সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান রাখেন এবং যাচাই বাছাই করায় নিরঙ্কুশ দক্ষতা রয়েছে যাদের। সংশ্লিষ্ট প্রতিযোগী এবং কৌতূহলী দর্শক বোদ্ধা সবাই তাদের মহান আস্থা গচ্ছিত রাখেন এই বিচারকের বুদ্ধি বিবেচনা এবং বিষয়জ্ঞানের ওপর। ‘ব্যাক স্ট্রোক’ ইভেনে কোন প্রতিযোগী ‘ফ্রি স্টাইল’ সাঁতরে সবার আগে ‘বৌ’ ছুঁয়ে দিলে কি গ্রহণযোগ্য সমর্থন পাবে, না বৈধতা পাবে?

কবিতা তো শিল্প বটেই, আর কিশোর কবিতাও কবিতা-ই। কিশোর মনের আবেগী কল্পনা ও প্রকরণের প্রত্যাশিত শিথিলতা স্বীকার করেই কবিতার বৈশিষ্ট্যসূচক বিষয়, বক্তব্যের চমৎকারিত্ব, ছন্দ-মাত্রা-মিল-রীতির নিপুণ প্রয়োগ, চিত্রকল্প প্রতীক উপমা ইত্যাদির যথাযথ ব্যবহার এবং কাব্যময় দ্যোতনা সৃষ্টির পারঙ্গমতা যে রচনাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করবে তাই তো কবিতা। আর যে রচনায় তা হয়ে উঠবে সবচেয়ে বর্ণিল, উজ্জ্বল ও সাযুজ্যময়, সেটাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে পারে। প্রতিযোগিতার পঙক্তি-দৌঁড়ে বিচারকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আবার এই সিদ্ধান্তের বৈধতাও কখনো কখনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে, যদি নির্বাচকের বিচারিক দৃষ্টি-সাম্যতা রসজ্ঞ পাঠকের বোধ, বুদ্ধি, মেধা, মনন ও ঔচিত্যবোধের কাছে বিপ্রতীপ স্বেচ্ছাচারে পর্যবসিত হয়। তখনই শুরু হয় তত্ত্বতালাশ, কাব্যের কোষ্ঠীবিচার এবং যোগ্যতা যাচাইয়ের নির্মম ব্যবচ্ছেদ। এরকম এক তত্ত্বতালাশ থেকেই এই নিবন্ধের আঁতুড়-মোচন।



ঈশানে জমলে মেঘ

এবার ২০০৭-এ এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কারের জন্য কিশোর কবিতার যে দু’টো বই নির্বাচিত হয়েছে, একটি শিবুকান্তি দাশের ‘রোদের কণা রুপোর সিকি’ এবং অন্যটি সুজন বড়ুয়ার ‘বুকের ভেতর শাপলা ফোটে’। মোট কতগুলো বই এবারের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে সে হিসাব এ মুহূর্তে সঠিক জানা না থাকলেও নিশ্চিত করে অংশগ্রহণকারী আরেকটি বইয়ের নাম জানার সৌভাগ্য হয়েছে বর্তমান নিবন্ধকারের। জুলফিকার শাহাদাৎ-এর কিশোর কবিতার বই ‘আকাশকে খোলা চিঠি’। একুশে বইমেলা ২০০৭-এ প্রকাশিত এ বইটি আগেই পড়া ও সংগ্রহে থাকায় চমৎকার এ বইটি সম্পর্কে পূর্বধারণা তো ছিলোই, কিশোর কবিতার একটি অবধারিত বই হিসেবেও সমীহ আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিলো। অতএব, এটাকে ডিঙিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব আদায় করে নেয়া নির্বাচিত উপরোক্ত বই দু’টো অতিদ্রুত সংগ্রহ ও তা থেকে রস আস্বাদনের রোমাঞ্চ কি দমিয়ে রাখা যায়? অতঃপর যে অভূতপূর্ব(!) অভিজ্ঞতা, তা শেয়ার করার আগে নিবন্ধকারের তরুণ বয়সের নতুন জীবনের একটা রসময় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার ছোট্ট একটু বিরতি দিতে পাঠক নিশ্চয়ই কুণ্ঠিত হবেন না।

ফসল উঠে গেলে হেমন্তের শিশিরার্দ্র মাঠে দেশগাঁয়ে তখন বিভিন্ন জাতের মেলা আর যাত্রা-প্যাণ্ডেল বসানোর ধুম লেগে যেত। মা’কে পটিয়ে দশ বিশ টাকা যা পারলাম নিয়ে রাতে চুপেচুপে সোজা যাত্রা-প্যাণ্ডেলে। যাত্রা তো রাতের বেলায়ই হতো। মূল আকর্ষণের পাশাপাশি ছোটখাটো অনেক শো-প্রদর্শনী, হাউজি, জুয়ার নানান আসরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো। এসব চত্বর ঘুরে ঘুরে কৌতূহল আটকে গেলো শেষে আকর্ষণীয় একটা প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনী বা অপ্রদর্শনীও বলা যেতে পারে। থেমে থেমে যাত্রার ডায়লগের মতোই আওয়াজ আসছে- ‘দেখুন, প্রাণভরে দেখুন, নয়ন মন সার্থক করুন; আজব চিড়িয়া, জীবনের প্রথম বিস্ময়, মাত্র দশ সেকেণ্ড, চোখ জুড়িয়ে যাবে ভাষা হারিয়ে যাবে, মাত্র দুই টাকা, দেখুন দেখুন এই প্রথম এই শেষ, মাত্র দুই টাকা।’ দীর্ঘ লাইন। বাঁশের দরমা দিয়ে ছোট্ট ঘুপচি মতো একটা চৌকোণো ঘর ভারী কাপড়ে মোড়ানো, একজন করে ঢুকে কথিত সেই আজব জিনিস দেখে দেখে বেরিয়ে আসছে; তারপর আরেকজন, এভাবে। যে-ই দেখে আসে, কী জিনিস, জানতে চাইলে সরাসরি প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু বলে- দেখে আসেন! তাতে করে আগ্রহীদের আকর্ষণ আরো বেড়ে যাচ্ছে।

অবশেষে দু’টাকায় আমার দশ সেকেণ্ডের পালা। ঢুকলাম, যথারীতি দেখলাম এবং বিস্ময়ে হতবাক! আসলেই এমন অদ্ভুত দৃশ্য, কাউকে বলবো কী; দশ সেকেণ্ডই সহ্য করার জন্য অনেক দীর্ঘ সময় মনে হলো! কোনোভাবে পালিয়ে বাঁচি। বামন গোছের বিকট চেহারায় আস্ত নেংটো উদোম একটা মানুষ সারাগায়ে চুনকালি মেখে আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে মুখ ভেট্কাচ্ছে! এমন বীভৎস কুদৃশ্য যে-ই দেখে সে-ই হতভম্ব তো বটেই, নিজেকে প্রতারিত হবার নির্বুদ্ধিতা ঢাকতে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্ররোচনায় অন্য সবাইকেও বেমালুম দু’টাকা খসিয়ে দেখিয়ে নেয়াচ্ছে!

খুব স্থূলভাবে কিছু অশিক্ষিত রুচিহীন বা সুযোগ-সন্ধানী লোক এই যে কাজটি করছিল- তা নিরেট প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এই এরা ক’জনকে তা করতে পারতো? আমরা নিজেরাই তো নিজেদের প্রতারিত করিয়ে ওদের কুরুচিপূর্ণ ব্যবসাটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলতে সহায়তা করলাম। এটাই বোধকরি আমাদের মনস্তত্ত্ব!


সব মেঘে বৃষ্টি হয় না

শিবুকান্তি দাশের ‘রোদের কণা রুপোর সিকি’ বইটির প্রকাশক বাংলাদেশ শিশু সাহিত্য একাডেমী, চট্টগ্রাম। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী হাশেম খানের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে বোর্ড বাঁধাই বইটির আগাগোড়াই রঙিন ও আকর্ষণীয়। অন্তত ছবিগুলোতে শিশুরা মজা পাবে খুব। তবে বিচারিক মানদণ্ডে বইয়ের রচনাশৈলীর শুদ্ধতা ও চমৎকারিত্ব অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়ই। শিশুসাহিত্য হিসেবে এই গুরুত্বকে খাটো করে দেখা সঙ্গতও নয়। বইটি পড়তে গিয়ে গুটিকয় প্রমাদ বা অশুদ্ধ বানান পাঠকের চোখে বালি পড়ার মতো খচখচ করে আটকে যেতে পারে। যেমন: জীন (পৃষ্ঠা-৫, ২য় চরণ, শুদ্ধ- জিন), গজিয়ে (পৃষ্ঠা-১৩, ১০ম চরণ, শুদ্ধ- গর্জিয়ে), যওয়া (পৃষ্ঠা-১৬, ৫ম চরণ, শুদ্ধ- যাওয়া), ছাঁ (পৃষ্ঠা-১৭, ৩য় চরণ, শুদ্ধ- ছা)।

বইটিতে মোট চৌদ্দটি রচনা রয়েছে যেগুলোর শৈলী-বিন্যাস, বিষয়-বক্তব্যের প্রকাশভঙ্গী, প্রতীক উপমা চিত্রকল্প নির্মাণে দ্যোতনা সৃষ্টির প্রয়াস বিশ্লেষণ করে আমরা সাহিত্য প্রকরণে ছড়া, পদ্য ও কবিতা হিসেবে রচনাগুলোকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারি। এক্ষেত্রে মাত্রা ও ছন্দের গতিময়তা, বিষয়-বক্তব্যের নাটকীয় উপস্থাপন ও কৌতুকময়তা বিবেচনায় নিলে ‘লোডশেডিং’কে ছড়া; বিষয়ের বর্ণনাধর্মীতা বিবেচনায় এনে ‘শীতের অতিথি পাখি’, ‘যখন যেখানে যাই’, ‘সূর্যের আহ্বান’, ‘যুদ্ধাহত বাবা’ ও ‘জলসিঁড়ি ঝিরঝিরি’কে পদ্য এবং চিত্রকল্প নির্মাণ ও প্রতীক উপমার প্রয়োগের মাধ্যমে অর্থদ্যোতনা সৃষ্টি বিবেচনায় ‘চাঁদের সাথে হাওয়ার সাথে’, ‘একটি ছেলের বড় হওয়া’, ‘বত্রিশ নম্বর বাড়ি’, ‘বৃষ্টি মেয়ে বৃষ্টি থামাও’, ‘অচিনপুরের গল্প’, ‘কবি’, ‘বিকেল যখন কমলা রঙের’ ও ‘ঘুম ভেঙে যায়’-কে কবিতা হিসেবে রচনা-প্রয়াস বলে ধরে নিতে পারি আমরা। বৈচিত্র্য বা নিরীক্ষাহীন প্রথাগত ছন্দ প্রকরণে লিখিত রচনাগুলোর কোথাও কোথাও অন্তমিলের দুর্বলতা, মাত্রা কেটে যাওয়া, বাক্য গঠনে বক্তব্যের অস্পষ্টতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয় উপস্থাপনায় সাযুজ্যহীনতা রচনার মান ক্ষুণ্ন করেছে।

পদের অন্তমিলে ‘ভাই/যায়, খুব/রূপ, থালা/একেলা, পুরো/শুরু, কাজ/নাচ’-এর মাধ্যমে মিল দেয়ার প্রচেষ্টা সংশ্লিষ্ট রচনা-শৈলীকে নিখুঁত হতে দেয়নি। তবে ছন্দের ক্ষেত্রে মাত্রা ব্যবহারে লেখক আরেকটু সতর্ক হলে পাঠকের কানে ছন্দের পতনটাও এমন খট্ করে বাজতো না। যেমন- ‘চোখ নেই তার গর্ত যেখান মাথায় ওড়ে ধোঁয়া/ লুলা হাতে হেলে দুলে ডাক ছাড়ে ওঁয়া ওঁয়া’- (লোডশেডিং)।

চারমাত্রার স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা ‘ডাক ছাড়ে ওঁয়া ওঁয়া’ পর্বটিতে একটি অতিরিক্ত মাত্রার শ্রুতিকটুতাকে পাঠকের কান কিছুতেই এড়াতে পারে না। একইভাবে ‘সবকিছু আজ ছেড়ে ফুঁড়ে খুব উদাসীন/ কেমন যেন হচ্ছে ছেলে দিন দিন দিন’-(একটি ছেলের বড় হওয়া), এটা চারমাত্রার স্বরবৃত্ত ছন্দ। কানে সয়ে গেলেও ‘দিন দিন দিন’ পর্বে একমাত্রা পড়ে গেছে। এখানে ‘উদাসীন’ শব্দের নিস্পৃহভাবের সাথে ‘ফুঁড়ে’ শব্দের তীব্রতা বেমানান ও পরস্পরবিরোধী মনে হয়েছে।

কখনো কখনো বক্তব্যের উদ্ভট উপস্থাপন রচনাকে এলোমেলো করে দিতে পারে। যেমন- ‘একটি পাখি শান্ত পাখি খুব ভালো সে খুব/ সাগর নদী বিলের ধারে কী যে অপরূপ/ নিসর্গই বাংলাদেশে ওদের এনে রাখে/ ওদের প্রতি সবার যেন ভালোবাসা থাকে।’-(শীতের অতিথি পাখি) পদ্যাংশটি এর একটি উদাহরণ। ‘যখন যেখানে যাই/ মনে পড়ে তাকে/ আর চোখে দেখি রোজ/ স্নেহময়ী মাকে।’-(যখন যেখানে যাই) এরকম পঙক্তি রচনা লেখকের দুর্বলতাই প্রকাশ করে।

শব্দের ভুল ব্যবহার এবং শুধু ছন্দ মেলানোর জন্য যেমন তেমন শব্দের ব্যবহারও একটা রচনার উপভোগ্যতা নষ্ট করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ‘চারিদিকে পাকসেনাদের হত্যানিধন খেলা/ গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হতো প্রতিরাতের বেলা/ বাড়ির পরে জ্বলছে বাড়ি আগুন ওদের হাতে/ খানসেনারা পালিয়ে যেতো রাতের শেষে প্রাতে/ ডিসেম্বরের ‘বারো’ তারিখ সন্ধ্যা যখন নামে/ তোমার সাথে পাকসেনাদের যুদ্ধ চলে গ্রামে/ মধ্যরাতে পাকসেনারাও পিছু হটে যায়/’-(যুদ্ধাহত বাবা) পদ্যাংশটির প্রথম চরণে খেলাটা ‘হত্যা হত্যা’ হতে পারতো; ‘হত্যানিধন’ হওয়ায় আসলে যে হত্যাটাই নিধন হয়ে যায়, লেখক হয়তো সেদিকটাতে নজর দেননি। উল্লিখিত সাতটি পঙক্তিতে ‘পাক’ বা ‘খানসেনা’ শব্দবন্ধের চারবার ব্যবহারও পুনরোক্তিদোষে দুষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও ‘প্রতিরাতের বেলা’ ‘খানসেনারা’ যখন ‘রাতের শেষে প্রাতে’ ‘পালিয়ে যেতো’ বলে বিষয়সিদ্ধ করা হয়েছে তখন ‘ডিসেম্বরের বারো তারিখ’ পাকসেনাদেরকে ‘মধ্যরাতে’ পিছু হঠানোর দরকার ছিল কি? একই পদ্যের সর্বশেষ দু’টো চরণ- ‘তবু তুমি নিজের কথা ভুলেই গিয়ে সব/ বিজয় দিনে গর্ব করো আনন্দ উৎসব।’-এর শেষ চরণের বাক্য গঠন যথাযথ ও অর্থবোধক হলো কি না তাও ভেবে দেখা দরকার।

‘বৃষ্টি মেয়ে বৃষ্টি থামাও’ শিরোনামের কবিতা-প্রয়াসটির এক জায়গায় ‘দিন মজুরের বন্ধ হলো দিনের যতো কাজ/ অভাব পাখি তাদের ঘরে নিত্য করে নাচ।’পঙক্তি রচনায় জোর করে চিত্রকল্প(!) আঁকতে গিয়ে লেখক এখানে ভুলেই গেলেন যে কষ্টে বা দুঃখে কেউ নাচে না; নাচ ক্রিয়াটা কেবলই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। শিশু-কিশোরদের প্রিয় একটা অনুষঙ্গ ‘পাখি’র সাথে অভাবের প্রতীকী নির্মাণ-প্রয়াসের আগে লেখকের অন্তত: ভাবা উচিৎ ছিল যে শিশুসাহিত্য চর্চায় শিশু মনস্তত্ত্বটাকে হেলাফেলা করা ঠিক নয়। আবার ‘জলসিঁড়ি ঝিরঝিরি’ পদ্যে ‘মামনিটা রোজ আমাকে মিষ্টি দুপুর মিষ্টি রাতে/ জড়িয়ে বুকে আঁচল ঢেকে রাখবে শুয়ে যেখানটাতে/ সেখান থেকে পালাই আমি মামনি যেই ঘুমিয়ে পড়ে’-তে ‘রাখবে’ শব্দটির ব্যবহার ঘটনার কালবাচকতা ও অর্থবোধকেও এলোমেলো করে দিয়েছে। মূলত রচনাটিকেই নষ্ট করে দিয়েছে।

‘সবুজ ডানার সবুজ টিয়ে পাখি/ নীল আকাশে দৃষ্টি আমার রাখি/ ছবির রাখাল গরু চরায় মাঠে/ লাঙল দিয়ে চাষিরা ধান কাটে।’(অচিনপুরের গল্প)। লেখক কি চাষিদের লাঙল দিয়ে ধান কাটতে সত্যি দেখেছেন! তিনি কি আর্কিটাইপ ভাঙতে চেয়েছেন, না কি অসচেতন ছিলেন? এটা শিশুসাহিত্য। চলিত ভাষায় রচিত (যা খুবই স্বাভাবিক ও চলমান প্রথাসিদ্ধ) ‘বিকেল যখন কমলা রঙের’ শিরোনামের চমৎকার রচনাটির সর্বশেষ পঙক্তি ‘তারা ভাবেন সুবোধ খোকা বাধ্য তাহাদের’-এ শুধু কি ছন্দ মেলানোর জন্যই সাধুভাষায় ‘তাহাদের’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে?

কোনো সৃষ্টিকর্ম থেকে রস আস্বাদনে পাঠক তাঁর নিজস্ব মেধা-মননের ব্যবহার করবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে আস্বাদন প্রক্রিয়াটা যথাযথ কিনা তাও প্রশ্ন-সাপেক্ষ। তাই পাঠকের সাথে লেখকের ভাব বিনিময়ের একটা সম্বন্ধ-সূত্র তৈরি করাও জরুরি। আর এ জন্যেই লেখকের সৃষ্টিকর্মের বিশ্লেষণ যেমন দরকার, তেমনি রসজ্ঞ পাঠকের মতামতকেও খাটো করা চলে না।এরই ধারাবাহিকতায় প্রাসঙ্গিকভাবেই ‘সমালোচনা সাহিত্য’টাকেও পরিপুষ্ট করা আজ যুগের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার যেটুকু সামর্থ্য রয়েছে তা দিয়েই এই শিশুসাহিত্যেও সমালোচনা সাহিত্যের আপাত একটা নির্মল স্রোতধারা বইয়ে দেয়া যেতে পারে, যা কালে কালে তার নিজস্ব নাব্যতা তৈরি করে নেবে।


সব বৃষ্টিই বৃষ্টি নয়

সুজন বড়ুয়া, সৃজনশক্তি ও নিজস্ব সুকৃতি দিয়েই আমাদের শিশু সাহিত্যে বিশেষ করে কিশোর কবিতা অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলে অনেকে মনে করেন। শিশুসাহিত্যে পুরস্কার ভাগ্যে সমৃদ্ধ এই কবির ‘বুকের ভেতর শাপলা ফোটে’ বইটিও এবার ‘এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০০৭’-এর গৌরব অর্জন করেছে। বইটির প্রকাশক দৃষ্টি প্রকাশ, ঢাকা। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৭। উল্লেখ্য, এই আগস্ট ২০০৭-এ বাংলাদেশ শিশু সাহিত্য একাডেমী, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সুজন বড়ূয়ার ‘কিশোর কবিতা সমগ্র’তে ‘বুকের ভেতর শাপলা ফোটে’ বইটির কবিতা পদ্য ছড়া মিলিয়ে মোট বাইশটি রচনা গ্রন্থভুক্ত হয়েছে, যা ব্ক্ষ্যমান নিবন্ধের সূত্র হিসেবে বিবেচনায় এসেছে।

পুরস্কারে নির্বাচিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে এবং রসগ্রাহী পাঠক হিসেবে খুব স্বাভাবিকভাবেই পাঠতৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে চাঁদের কলঙ্কের মতো কিছু বিচ্যুতি ঠিকই চোখ ও কানের স্বতঃস্ফূর্ত সাবলীলতায় আঁচড় দিয়েছে। চাঁদের কলঙ্ক চাঁদের সৌন্দর্য্যকে মহিমান্বিত করলেও কাব্যরচনার এই বিচ্যুতিগুলো কাব্যকে কোন্ মহিমায় অন্বিত করবে তা নিয়ে আলোচনার অবকাশও রয়েছে। বিশেষ করে কিছু আরোপিত শব্দের ব্যবহার ও ছন্দমাত্রার বিচ্যুতি রচনার ঔজ্জ্বল্য ম্লান করেছে বলেই ধারণা।

প্রথমে রচনাশৈলী ও বিষয়-বক্তব্যের প্রকাশভঙ্গী বিশ্লেষণ করে বইটির ‘কানামাছি’কে ছড়া; ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০০৬’, ‘নাম যাই হোক’, ‘আমাদের নববর্ষ’, ‘দুই বোন’, ‘গরিব ধনী’ ও ‘বাংলাদেশের নোবেল ইউনূস’ রচনাগুলোকে পদ্য এবং বাকি পনেরটিকে কবিতা রচনা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে উপরোক্ত বিচ্যুতির বিষয়গুলো আলোচনা করা যেতে পারে।

‘নাম যাই হোক’ পদ্যটিতে ‘নাম যাই হোক সাদা-কালো/ কাজ যদি হয় সু-গোছালো’ পঙক্তি রচনায় ‘সু-গোছালো’ শব্দটি কি যথাযথ ও ব্যাকরণসিদ্ধ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে? ‘সুন্দর’, ‘গোছালো’, এসব বিশেষায়িত বাংলা শব্দ এমনিতেই পরিপূর্ণ ইতিবাচক শব্দ। এদেরকে বিউটিপার্লারে নিলে বরং সৌন্দর্যহানিই ঘটে। তাই বাংলা ভাষায় ‘সুসুন্দর’ শব্দ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি ‘সুগোছালো শব্দটিরও গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে মনে হয় না। শুধুমাত্র ছন্দের মাত্রা মিলানোর জন্যই লেখকের এই শব্দ-ভ্রম ঘটেছে বললে কি ভুল বলা হবে?

‘কখনো কোমল কখনো কঠিন/ হতাশায় আনি খুনরাঙা দিন’-(শব্দটা স্বাধীনতা)। হতাশায় কি খুনরাঙা দিন আসে? দিনটা ধূসর-রঙা হতে পারে, ম্যাড়ম্যাড়ে বা কালো হতে পারে। অন্যভাবে ক্ষোভ, বিক্ষোভ বা যুদ্ধ খুনরাঙা দিন আনতে পারে; হতাশায় তো অবশ্যই নয়। দুর্ভাগ্যবশত লেখকের মনোযোগ এখানে এড়িয়ে না গেলে হয়তো এ জায়গাটায় পাঠক হতাশ হতেন না।

‘শব্দটা স্বাধীনতা’ শিরোনামের কবিতাটা শুরু হয়েছে এভাবে- ‘সেই যে আমরা আগে বলতাম কত কথা সুবচন,/ হয়তো করেছি কত না রঙিন শব্দ উচ্চারণ।’ কিন্তু যা কথা তাই তো বচন। ফলে প্রথম পঙক্তিতে অভিন্ন অর্থের দু’টো শব্দ ‘কথা সুবচন’ পাশাপাশি প্রয়োগ করায় কাব্যবিবেচনায় মনে হয় সুবচন আর সুবচন থাকেনি।

সুজন বড়ুয়ার প্রথম দিককার প্রকাশিত গ্রন্থে কিশোর কবিতায় যে সামান্য নিরীক্ষাপ্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, আলোচ্য বইয়ে তেমন কোনো নিরীক্ষা চোখে পড়ে না। তবে কবিতার ছন্দমাত্রা নিয়ে খেলায় পারদর্শিতা দেখানোর চেষ্টায় কসুর করেননি। কিশোর-কবিতায় বহুল ব্যবহৃত স্বরবৃত্ত ছন্দের কথা বাদ দিলেও মাত্রাবৃত্ত ও স্বরমাত্রিক ছন্দে লেখা রচনাগুলো পড়লেই তার প্রমাণ মেলে। এছাড়া সাত মাত্রার জটিল মন্দাক্রান্ত ছন্দে রচিত ‘সেই যে তালগাছ’ কবিতাটি লেখকের শ্রমনিষ্ঠতার পরিচয় বহন করে। তারপরেও শ্রেষ্ঠত্ব নির্বাচনের বিচারিক মানদণ্ডে যাচাই করতে গেলে নির্মোহ বিশ্লেষণে ব্যবচ্ছিন্ন করার অধিকার রসজ্ঞ পাঠকেরও রয়েছে বৈকি। সে ক্ষেত্রে আলোচ্য বইটিতে মাত্রাগত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির ভিসেরা রিপোর্ট এড়িয়ে যাবার উপায় থাকে না।

‘এক আমি যায় সাগর ঢুঁড়ে/ মুক্তো-মানিক আনতে/ আরেক আমি ঠিক ছুটে যায়/ মঙ্গল গ্রহের প্রান্তে’- (আমার আমিগুলো)। স্বরবৃত্তের গতিময় ছন্দে রচিত কবিতাংশটা পাঠেই ‘মঙ্গল গ্রহের’ পর্বে এসে ঠিকই কানে বাজে একটি মাত্রা-আধিক্যের অমসৃণ স্বরবদ্ধতাটা।

স্বরমাত্রিক ছন্দে রচিত পদ্য ‘দুই বোন’। এর দু’টো পঙক্তি- ‘দুধ ডিমে’ দু’জনের বড়ই অরুচি/ ওদের যে প্রিয় খাওয়া হাওয়ার লুচি।’ পঙক্তি দু’টো মাত্রা বিশ্লেষণে দাঁড়ায়- (৪+৪+৪+২/ ৪+৪+৩+২) এ’রকম। অর্থাৎ নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয় পঙক্তিতে মাত্রাপতন ঘটেছে।

‘আমি যে স্বাধীন’ কবিতাটি স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। ‘পথ কাঁপানো গাড়ি নেই/ এমনকি স্কুটার নেই/ ফ্যাক্স-ই-মেল কম্প্যুটার নেই’-এ ‘নেই’ শব্দটিকে একমাত্রায় হিসার ধরে পঙক্তি পর্বগুলোর মাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- (৪+৩/৩+৩/৪+৩)। স্পষ্টতই এখানেও মাত্রাপতন ঠেকানো যায়নি, যা কানে গিয়ে ঠিকই ঠেকে।

একইভাবে স্বরবৃত্ত ছন্দে ‘ভুল কেন হয়’ কবিতাটির শুরুতেই ‘পাই না ভেবে তবুও ভাবি/ দিন রাত সব সময়/ কেন আমার এতো যে ভুল হয়!’-তে যে মাত্রাগত অসংগতি নজরে আসে তা কি ভুল! ‘সুখ’ কবিতাটির স্বরবৃত্ত ছন্দে- ‘পাবো কি সেই মেঠোপথে ধুলো খেলার সুখ?/ পাবো না ঠিক জানি,/ তবুও কি হার মানি?’-এর শেষ পঙক্তিতে ‘তবুও’ শব্দটি থেকে ‘ও’ বর্ণটি বাদ দিয়ে একটি মাত্রা ঝেরে ফেললেই ছন্দটাও সাবলীল হতে পারতো।

একটা কবিতার বইয়ে উপরোক্ত বিচ্যুতিগুলোকে চুলচেরা জেরায় হয়তো বা জর্জরিত হতে হতো না, যদি না বিষয়টা শ্রেষ্ঠত্ব নির্বাচনের বিচারিক মানদণ্ডের কাঠগড়ায় দাঁড়াতো। পাঠকের দরবার আসলেই খুব শক্ত জায়গা।


এই অবেলায় খোলা চিঠি আকাশকেই দেয়া যায়

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। কিন্তু জুলফিকার শাহাদাৎ কি মানুষের ওপর নির্ভর করতে পারছেন না? তাই কি তিনি এই অবেলায় এসে ‘আকাশকে খোলা চিঠি’ দেন? আকাশ এতো উদার বলেই হয়তো তাঁর কিশোর মনের ভাবালুতা, কষ্টমগ্নতা, বুকের গভীরে চাপা চেনা-চেনা তবু অচেনা দ্রোহের সপ্ত-সংলাপগুলো, পায়রা পায়রা স্বপ্নগুলো অদ্ভুত ব্যঞ্জনায় আকাশের শাদা না কি নীল বুকটাতে মেখে দিতে চান। আকাশও যে কী! এটুকুতেই সেও এমন জলল হয়ে উঠতে পারে? তাই কি-

‘কতই কান্না দেখেছি এ চোখে, অশ্রু দেখেছি কত/ আজ আকাশের অঝোর কান্না ঝরে দেখি অবিরত।/ আকাশ কেনো যে কাঁদে?/ ভাসা ভাসা চোখে কালো ছায়া মেখে কাঁদে কোন অপরাধে?’-(আকাশকে খোলা চিঠি/ জুলফিকার শাহাদাৎ)। অথবা- ‘আমার এ চোখ আঁধার সরিয়ে আলোর ঠিকানা পেতে/ বুনো মৌচাকে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে উল্লাসে ওঠে মেতে/ হাতড়িয়ে খুঁজে রোদের পেয়ালা, বাবুই পাখির বাসা,/ আমার এ চোখ শিকারি ভীষণ, খুঁজে ফেরে ভালোবাসা।’- (আমার এ চোখ/ জুলফিকার শাহাদাৎ)।

মন্ত্রের মতো এমন আবেগমন্দ্রিত পঙক্তি গলে গলে যার কলম দিয়ে ঝরতে পারে সেই জুলফিকার শাহাদাৎ-এর ‘আকাশকে খোলা চিঠি’ নামের কিশোর কবিতার আশ্চর্য বইটিও অমর একুশে ২০০৭-এ প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা ‘ছোটদের মেলা’। হাশেম খানের প্রচ্ছদ আর জাহিদ মুস্তাফার অলঙ্করণে সবার জন্যই আকর্ষণীয় বইটির পরতে পরতে আঁকা পঙক্তিগুলো নিজেরাই অসংখ্য কাব্য দ্যোতনা নিয়ে পাঠক-মনকে এভাবেই নাড়া দেয় যে, তা ব্যাখ্যা করার বাতুল প্রয়াসে যাবার মতো নির্বুদ্ধিতা অন্তত এ নিবন্ধকারের নেই। কেউ যদি ভেবে বসেন যে এই উচ্ছ্বাসে আবেগের মাত্রা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে, তাহলে অনুরোধ রইলো মনটাকে নিবিষ্ট করে বইটার মোট একুশটি কবিতা পুনঃপাঠ করে নিতে। নিবন্ধকারের সীমাবদ্ধ জ্ঞান আর মোটাবুদ্ধিতে কোথাও একটি বানান-প্রমাদ বা ছন্দের মাত্রা বিচ্যুতিও চোখে পড়েনি। যা পড়েছে তা হলো অসম্ভব শ্রমনিষ্ঠ সাবলীল নিরীক্ষার এক অদ্ভুত অর্জন। স্বরদ্যোতনার স্বতন্ত্র স্বর, স্বরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত ও স্বরমাত্রিক ছন্দ প্রয়োগে তুখোড় দক্ষতার পাশাপাশি ছন্দ ভাঙার এক অপূর্ব ছন্দময় খেলা আর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য চমৎকার চিত্রকল্প নির্মাণশৈলী দিয়ে চিরায়ত কিশোরের মনস্তাত্ত্বিক বুকের স্বচ্ছ-দীঘিতে গভীর ডুব দেয়ার ঈর্ষণীয় পারঙ্গমতা। শিশুসাহিত্যের এক মহার্ঘ সম্পদ হিসেবে বইটিকে বিবেচনা করা যেতে পারে। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার যে, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০০৭-এর অন্যতম প্রতিযোগী হওয়া সত্ত্বেও বইটি কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের যুগ্ম আসনে ঠাঁই পায়নি বা ঠাঁই দেয়া হয়নি। ‘হা সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’



কান্নার ভাষা কান্নাই জানে

তত্ত্বজ্ঞানহীন সাধারণ পাঠকের হৃদয়টাই সম্বল। তাই বলে পাঠককে মূর্খ ভাবাটাও ঠিক নয়। হৃদয়বৃত্তির অভিজ্ঞ জিহ্বা দিয়েই শিল্প-ব্যঞ্জনের বিচিত্র স্বাদ-গন্ধ-রস চেখে দেখতে অভ্যস্ত এঁরা। ব্যঞ্জনের স্বাদ নিতে রন্ধনশিল্পে পারদর্শিতা অর্জনেরও প্রয়োজন পরে না; শুধু শিক্ষিত জিহ্বা থাকলেই চলে। আবার একাধিক রন্ধন-শিল্পীর শিল্পদক্ষতার বৈচিত্র্য অভিন্ন জিহ্বায় যাচাই করতে হলে মেনু বা বিষয়-আইটেমও অভিন্ন হওয়া বাঞ্চনীয়। কবি তো আর ফরমায়েশি শিল্পকর্মী নন; শিল্প রচনায় কবি স্বাধীন, একক এবং সার্বভৌম। তাই পাঠকের অভিন্ন হৃদয়-জিহ্বায় চেখে দেখার লক্ষে আলোচ্য বই তিনটি থেকে একেবারে অভিন্ন না হলেও ভিন্ন নয় এমন কাছাকাছি উপজীব্য বিষয়ের উপর গুটিকয় শিল্প-ব্যঞ্জনের নমূনা পাশাপাশি উপস্থাপন করা হলো।


বৃষ্টিকে অনুষঙ্গ করে রচিত তিনটি কবিতার প্রথম একাংশ-

‘বৃষ্টি তুমি কোথায় থাকো, কোথায় তোমার বাড়ি?/ রোদের সঙ্গে তোমার কেন এত আড়াআড়ি!/ রোদের আঁচে পোড়ে যখন মানুষ-বৃক্ষ-ভূমি/ তোমায় ডেকে ডেকেই সারা, তাও আসো না তুমি,/ মেঘের জালে রোদ হারালে তবেই আসো ধেয়ে/ তুমি কি সেই দূর আকাশের কালো মেঘের মেয়ে?’- (বৃষ্টি তোমার ছোঁয়া/ সুজন বড়ুয়া)।

‘কালো মেঘে আকাশখানা যেই ঢেকেছে পুরো/ ঠিক তখনই বৃষ্টি মেয়ের কান্না হলো শুরু/ ঝুম ঝুম ঝুম টাপুর টুপুর ঝরে জলের ধারা/ ঘর ছেড়ে দূর মাঠে যেতে মনটা করে তাড়া।’- (বৃষ্টি মেয়ে বৃষ্টি থামাও/ শিবুকান্তি দাশ)।

‘বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে/ মেঘলা মেয়ের একলা দু’চোখ/ উপুড় করে/ বৃষ্টি পড়ে।/ বৃষ্টি পড়ে/ শব্দ করে/ শব্দ কিসের?/ শব্দ তো নয়/ দুঃখ ব্যথা/ কান্না হাসির/ লিরিক ঝরে/ বৃষ্টি পড়ে।’- (বৃষ্টি যদি দৃষ্টি পেতো/ জুলফিকার শাহাদাৎ)।


চাঁদ বা আকাশ যেখানে অনুষঙ্গ-

‘চাঁদটা ওঠে দূর আকাশে নির্বাক নিশ্চুপ/ কিন্তু দেখি সেই না চাঁদের কত রকম রূপ!/ কত আকার কত বাহার কত যে তার খেলা/ কখনো সে গড়িয়ে যাওয়া যেন মাটির ঢেলা,/ কখনো ঠিক একটি বেলুন অনেক অনেক দূরে-/ হালকা হাওয়ার পিঠে চড়ে বেড়ায় যেন যেন ঘুরে,’- (যে চাঁদটা/ সুজন বড়ুয়া)।

‘তোমরা কি ভাই রাত-দুপুরে না ঘুমিয়ে থাকো/ কিংবা একা একা বসে মনটা বাইরে রাখো।/ আলোর পাখি নীল জোনাকি যখন জমায় মেলা/ তখন কি কেউ নদীর কাছে যাও ছুটে একেলা।’- (চাঁদের সাথে হাওয়ার সাথে/ শিবুকান্তি দাশ)।

‘নিঝুম রাতে আকাশ পানে দু’চোখ মেলে চাই/ দেখি শুধু হাজার তারার মুগ্ধ পাড়াটাই।/ জোছনা মাখা চাঁদের হাসি/ ঝরে পড়ে রাশি রাশি,/ তখন আমি যাই ছুটে যাই ঘর থেকে ঠিক দূরে;/ শব্দ আসে ডাক শুনি কার? আসছে উড়ে উড়ে।’- (ডাক দিয়ে যায় কে/ জুলফিকার শাহাদাৎ)।


স্বদেশ, স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ যখন অনুষঙ্গ-

‘শব্দটা ধীর আর চঞ্চল/ সাত সূর্যের আলো ঝলমল/ যেন প্রজাপতি কী যে মোহনীয়/ শব্দটা তাই আমাদের প্রিয়/ শব্দটা তাই আমাদের চাই/ শব্দটা ছাড়া ফিরে যাওয়া নাই/ শব্দটা আর কিছু নয় সে যে স্বাধীনতা স্বাধীনতা,/ একাত্তরেই সে যাকে পেয়েছি ভেঙে সব নীরবতা।’- (শব্দটা স্বাধীনতা; তৃতীয স্তবক/ সুজন বড়ুয়া)।

‘ষোলই ডিসেম্বরে যখন স্বাধীন হলো দেশ/ পা হারিয়ে ডুকরে কাঁদো কষ্টের নেই শেষ/ তবু তুমি নিজের কথা ভুলেই গিয়ে সব/ বিজয় দিনে গর্ব করো আনন্দ উৎসব।’- (যুদ্ধাহত বাবা; ষষ্ঠ বা শেষ স্তবক/ শিবুকান্তি দাশ)।

‘সেই ছেলেটির শোকে এখন/ আকাশ কাঁদে/ পাখি কাঁদে/ নদীও কাঁদে সুরে/ বিবর্ণ এক স্বদেশ আঁকা মায়ের দু’চোখ জুড়ে।’- (বিবর্ণ স্বদেশ; তৃতীয় বা শেষ স্তবক/ জুলফিকার শাহাদাৎ)।


ভানুমতির খেল

শুরুতেই যে সন্দেহটা মাথায় রেখে এ নিবন্ধের অবতারণা বা আলোচনা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তা মূলত শিশুসাহিত্যের কিছু প্রাসঙ্গিকতা পাঠকের সামনে তুলে ধরা। সম্ভব হলো কি না পাঠকই বিচার করবেন। তবে আম-পাঠকের জ্ঞান-গম্যি যে গণনার অযোগ্য এই বোধটা বোধ করি শ্রেষ্ঠত্ব নির্বাচকদের মনে মননে ইদানিং দারুণভাবে ক্রিয়াশীল। তাই ভণিতার জের ধরে যে সন্দেহটা দানা বেঁধে আছে তা প্রকাশের আগে আরেকটা বিষয়ের শুদ্ধতা যাচাই আবশ্যক।

এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০০৬ শিরোনামে এম নুরুল কাদের ফাউণ্ডেশন কর্তৃক যে স্মারক প্রকাশনাটি প্রচারিত হয়েছিল তাতে ‘নুরুল’ বানানটি ‘দন্ত্য-ন-এ হ্রস্ব-উ-কার’ দিয়ে লেখা থাকলেও ইতোপূর্বে ২০০৪ সালেও আরেকবার এই পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক সুজন বড়ুয়া’র ‘কিশোর কবিতা সমগ্র’টির প্রচ্ছদের পেছনের ফ্ল্যাপে ‘দীর্ঘ-ঊ-কার’ ব্যবহার করে নামটি ‘এম নূরুল কাদের’ বানানে মুদ্রিত রয়েছে। নামের প্রতি সবারই না কি বিশেষ একটা দুর্বলতা থেকে যায়। প্রয়াত ব্যক্তি এর উর্ধ্বে থাকলেও নামের অস্তিত্ব নিশ্চয়ই মুছে যায় নি। তাই কোন্ বানানটি সঠিক তা আমাদের জানা উচিৎ। কিন্তু জানবো কিভাবে?

এবার তাহলে সন্দেহটা প্রকাশ করেই ফেলি। কিশোর কবিতার আলোচিত যে বই দু’টো এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০০৭-এর জন্য নির্বাচিত হয়েছে, সাহিত্যমানের বিচারিক মানদণ্ড যদি বাস্তবিক তা-ই হয়, তবে আমাদের সম্মানিত ও বিজ্ঞ নির্বাচকদের কাছে সবিনয় নিবেদন করি, তারা কি পাঠককে সত্যি সত্যি বুদ্ধু না রাম-ছাগল ভাবেন? নাকি এটা কোন ভানুমতির খেল! #

[‘ভোরের ডাক’ ঈদসংখ্যা ২০০৭]


... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...


(সম্পূরক সংযুক্তি)

‘আমাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ভানুমতির খেল’-
পাঠক প্রতিক্রিয়া ও লেখকের জবাবদিহিতা


-রণদীপম বসু

পাঠকের দরবার বড় শক্ত জায়গা- এই কথাটা যে লেখক যতো বেশি করে মাথায় ধরে রাখতে জানেন, আমার বিশ্বাস, সৃজনকর্মের ক্ষেত্রে তাঁর লেখকসুলভ দায়বদ্ধতা ততো বেশি কুশলী হতে বাধ্য। একইভাবে কোন পুরস্কারের নিমিত্তে পরিবেশিত সৃষ্টিকর্ম থেকে সেরা নমূনাটি বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সুযোগ্য(?) নির্বাচক বা বিচারকের বিস্ময়কর বোধে যদি কোন ইতিবাচক দায়বদ্ধতা না থাকে সেক্ষেত্রে লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা কতোটা হাস্যকর ভাঁড়ামোতে পর্যবসিত হতে পারে এরই একটি নমূনা হিসেবে পাঠকসুলভ উপলব্ধি থেকেই ‘আমাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ভানুমতির খেল’ শিরোনামে লেখা সমালোচনামূলক গদ্যটির সূত্রপাত।

সম্প্রতি ঘোষিত ‘এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার,২০০৭’-কে নমূনা ধরে ‘ভোরের ডাক ঈদ ২০০৭ বিশেষ সংখ্যায়’ প্রকাশিত এ গদ্যটির একটি ত্বরিত পাঠপ্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে গত ৯ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে ভোরের ডাক সাহিত্য সাময়িকীর পাতায় ছাপা হয়েছে। পাঠক যে আসলেই বুদ্ধু নন এবং তাঁর সংবেদনশীল মননচোখের সতর্ক প্রহরায় কিছু এড়ায় না, এটা উপলব্ধি করে সত্যি আবারো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় যে, আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে চলে আসা যত্তোসব জবরদস্তিমূলক বেলেল্লাপনাগুলো মুছে গিয়ে একদিন ফের ঠিকই মননে মেধায় এক সৃজনশীল সুষম প্রতিযোগিতার সুষ্ঠু আবহ তৈরি হবে এই দেশে। পাঠকপ্রতিক্রিয়াগুলো এরই ইঙ্গিতবহ।

পাঠক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় সমালোচনামূলক গদ্যটির দিকে প্রশ্নাকারে প্রধানত: যে তিনটি তীর্যক অভিযোগ ছুঁড়ে দিয়েছেন, পাঠকের কাছে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী একজন লেখক হিসেবে এতে সাড়া দেয়াটাকে আমি অবিচ্ছেদ্য দায়িত্বজ্ঞানে জরুরি কর্তব্য বলে মনে করছি।

প্রথমত: আমার লেখার সূত্র ধরেই তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন- পুরস্কার শ্রেষ্ঠ আর অশ্রেষ্ঠর মধ্যে আদৌ বিভেদ সৃষ্টি করে কিনা? ‘পুরস্কার নতুন কিছু সৃষ্টি করে না, এটা শ্রেষ্ঠ আর অশ্রেষ্ঠর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে’- আমার এ বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষন করে তিনি নোবেল পুরস্কারের উদাহরণ টেনে বলতে চেয়েছেন- পুরস্কার আছে বলেই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে এবং অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পরবর্তী প্রতিযোগিতায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টির তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠে। যথাপূর্ব সম্মান রেখেই তাঁকে বলতে চাই, প্রিয় পাঠক, কোন মহান সৃষ্টি কখনোই পুরস্কারের মোহকে সামনে রেখে সাধিত হয়নি। প্রয়োজনের নিমিত্তে স্রষ্টার নিজস্ব তাড়না আর অন্তর্গত উপলব্ধি থেকেই এর জন্ম। রেকর্ড ভাঙা আর রেকর্ড সৃষ্টি কোন সৃজনশীলতার মানদণ্ড হতে পারে না। এ যাবৎ মহান যেসব সৃষ্টিকর্মকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে, তা কি নোবেল পাওয়ার মোহে সৃষ্টি হয়েছিলো? আরো যেসব মহৎ সৃষ্টি নোবেল পেলো না, ওগুলো কি অনাসৃষ্টি হয়ে গেলো? মোটেও তা নয়। পুরস্কার মূলত: সমকালীনতার প্রেক্ষাপটে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে সর্বোত্তমটাকে বাছাই করে মূল্যায়নের স্বীকৃতি দিয়ে বৃহত্তর মনোযোগ তার দিকে আকৃষ্ট করতে পারে, এটুকুই। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে বাছাইয়ে গড়বড় হলেই। যোগ্যতমের সুযোগ্য মূল্যায়ন না হলে বরং বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতকেই
বঞ্চিত করা হয়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই হোক। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস দর্শনের নির্মল অনুসারীরা একে একে নোবেল পেলেও একাধিকবার মনোনীত হয়েও গান্ধী যে নোবেল পেলেন না, হালে নোবেল কমিটির প্রকাশিত আক্ষেপ কি তা প্রমাণ করে না?

দ্বিতীয়ত: সমালোচনাটিতে বামন গোছের বিকট চেহারার আস্ত নেংটো উদোম একটা মানুষ প্রদর্শনী সংক্রান্ত লেখকের যে রসময় পূর্ব অভিজ্ঞতার রূপক বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তা রুচিবান পাঠক হিসেবে তাঁর সুরুচিতে আঘাত করেছে বুঝতে পারছি। এবং আমি যে ব্যর্থ হইনি, একই সাথে আশাবাদী হয়ে উঠছি এই ভেবে যে, চারপাশে এতোসব কুরুচিপূর্ণ ক্রিয়াকাণ্ড দেখেশুনে এখনো সবার তীব্র রুচিবোধ অন্তত: ভোতা হয়ে যায়নি। আমি অত্যন্ত দুঃখিত পাঠক। কিন্তু ‘যাহা বাস্তব তাহাই সত্য, বাস্তবতাকে অস্বীকার করা মানে নিজের অস্থিত্বকেই অস্বীকার করা।’ রুচিবোধ ব্যাপারটাই আপেক্ষিক। রবি ঠাকুরের সমকালীনতাকে বর্তমান প্রেক্ষাপট দিয়ে কি তুলনা করা চলে? আপনিই বলুন, জমজমাট একটা মেলায় দু’তিন জন ধড়িবাজ প্রতারকের নোংরা একটা খেলা যখন বিনা বাধায় বিনা প্রতিবাদে খণ্ডকালীন সফল ব্যবসায় পরিণত হয়ে উঠলো, চোখ বন্ধ রাখলেই কি সেই বাস্তবতা মিথ্যে হয়ে যাবে? চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের অসার রুচিবোধের গায়ে সত্যভাষণের তীব্র ঘা দেয়া ছাড়া অন্য উপায় আছে কি? আমি তো কোন মৌলিক সৃষ্টিকর্মে বসিনি। ত্রিকাল-প্রাজ্ঞতায় বিজ্ঞ চোখগুলো যখন সুচতুর রাজতোষণে ব্যস্ত, সেই অবোধ শিশুর মতো আমিই না হয় বলে ফেললাম- রাজা তো নেংটা! কাউকে না কাউকে তো বলতেই হবে। এবার বলুন, কুরুচির দায় কার ঘাড়ে চাপাবেন? ওই শিশুর, না রাজার, নাকি আমরা যারা দেখেও না দেখার ভান ধরে নিজেদের প্রতারিত করে যাচ্ছি- তাঁদের?

শিবুকান্তি দাস এর ‘রোদের কণা রুপোর সিকি’ এবং সুজন বড়–য়ার ‘বুকের ভেতর শাপলা ফোটে’ পুরস্কারপ্রাপ্ত এ দুটো কিশোর কবিতা বইয়ের সাথে তুলনামূলক আলোচনায় কেবল জুলফিকার শাহাদাৎ এর ‘আকাশকে খোলাচিঠি’ বইটিকেই কেন ভিত্তি ধরা হলো? এক্ষেত্রে আরো দু’একটি কিশোর কবিতার বইয়ের প্রসঙ্গ উপস্থাপন না করায় সমালোচককে যেভাবে পক্ষপাতদুষ্টতায় অভিযুক্ত করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে ক্ষুব্ধ পাঠকের পাঠতৃষ্ণাকে যথাযোগ্য শ্রদ্ধা রেখেই মূল আলোচনাটা পুনরায় পড়ে দেখার অনুরোধ করি। কেননা ওখানেই এর জবাবও দেয়া আছে। তবুও অবগতির জন্য আবারো বলছি। এম নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০০৭-এর প্রতিযোগিতায় ঘোষিত বই দুটো ছাড়া আর কতগুলো এবং কোন্ কোন্ বইগুলো উপস্থাপিত হয়েছে সেটা আমার মতো একজন সাধারণ পাঠকের জানার আদৌ কোন সুযোগ আছে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

তৃতীয় অর্থাৎ জুলফিকার শাহাদাৎ এর বইটি অংশগ্রহণে পাঠানোর সাথে এ সমালোচকের ঘটনাচক্রে সাক্ষ্যসংশ্লিষ্টতা থাকার কারণেই নিজস্ব কৌতূহলে বইগুলো পাঠ এবং এর উপলব্ধিসৃষ্ট প্রতিক্রিয়া হিসেবে ওই সমালোচনামূলক গদ্যটি লিখা এবং সচেতন পাঠকের সামনে উপস্থাপনার প্রয়াস। পুরস্কার-দাতারা যদি এমন কোন তালিকা সরবরাহ বা প্রকাশ করতেন, রসজ্ঞ পাঠক হিসেবে সবার মতো আমারও সুযোগ হতো আরেকটু চেখে দেখার। অতএব এ ক্ষেত্রে পাঠক, আপনার মতো আমারও অভিজ্ঞতা এই তিনটিতেই সীমাবদ্ধ।

মো: মোস্তাফিজুর রহমান নিরপেক্ষ সমালোচনা বলে যে প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন তাতো আসলে হাইপোথিটিক্যাল অন্ধতারই নামান্তর। নিরপেতার নাম দিয়ে চোখ বন্ধ রেখে সুবিধাবাদিতার সুবিধা নেয়া যেতে পারে, কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ অলীক সততা দিয়ে সমালোচনা চলে না। অপ্রিয় হলেও অক্ষুণ্ন সততায় স্পষ্ট কথা বলাটাই সৎ সমালোচনা। অস্পষ্ট বক্তব্য মানেই স্বচ্ছ বোধের অভাব, নয়তো এক ধরনের প্রতারণা। তাই তুলনামূলক আলোচনায় যা সত্য বলে বুঝেছি, সেই ‘আকাশকে খোলাচিঠি’-কে সেরা বলেছি। এতে পাণ্ডিত্য না থাকতে পারে, কিন্তু ভণ্ডামী নেই। আর সংশ্লিষ্ট পাঠকের প্রতি অনুরোধ, কবিতা বিশ্লেষণ করে কিশোর বা শিশুমনের ভাবালুতা বা কষ্টমগ্নতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন মন্তব্য ছোঁড়ার আগে তাদের মনস্তত্ত্বটা আরেকটু নেড়েচেড়ে দেখে নেয়া উচিৎ নয় কি?

শিশু বা কিশোররা কিছু বুঝে না- এমনটা ভাবা হবে সত্যিই এক নিবর্তনমূলক ভুল। কালান্তরে সংশোধনের অযোগ্য হয়ে ওঠার আগেই ভাবনাটাকে রিভিয়্যু করে নেয়া যৌক্তিক হবে। আমাদের উত্তীর্ণ-বয়সীদের বাস্তবতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ আঙ্গিনার তুলনায় তাদের উন্মুক্ত অপার জগত অনেক বেশি বিস্তৃত, বর্ণিল ও মায়াবী। ওখানে স্বপ্ন কল্পনা আর বাস্তবের মাঝখানে কোন বিভেদ-দেয়াল নেই এবং তা থাকাও ঠিক নয়। তাই ‘আকাশকে খোলাচিঠি’ কবিতার ভাষায়- ‘কতই কান্না দেখেছি এ চোখে, অশ্রু দেখেছি কত/ আজ আকাশের অঝোর কান্না ঝরে দেখি অবিরত।’-এর মতো পংক্তিগুলো কিশোর সংশ্লিষ্টতা থেকে স্বার্থপরের মতো ছিনিয়ে নেয়ার আগে আমরা এটাই বা ভুলে যাচ্ছি কেন- জসীম উদদীনের ‘কবর’ জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোন এক মাকে’ বা শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ এর মতো আরো অনেক উত্তীর্ণ বয়সী কবিতাই কিশোরপাঠ্য হিসেবে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর পাঠ্যক্রম তালিকায় অনায়াসে জায়গা দখল করে আছে, অত্যন্ত যুক্তিসংগতভাবে।

পরিশেষে, বানান জনিত বিচ্যুতি বা মুদ্রণ প্রমাদের বিষয়টাকে নজরে না আনলে হয়তো আলোচনাটাই অপূর্ণ থেকে যাবে। দৃষ্টিগ্রাহ্যতাকে অগ্রাহ্য করেও শ্রবণজনিত উদারমনস্কতা দিয়ে ভাব বিনিময়ের কাজ চালিয়ে নেয়া গেলেও পরীক্ষার খাতায় বা যোগ্যতা নিরূপক প্রতিযোগিতায় এরকম বানান বিচ্যুতি কতোটা গ্রহণযোগ্য হবে? এগুলো ছাড়া যোগ্যতমকে বাছাইয়ের আর কোন্ গুপ্ত মানদণ্ড বাকী রয়ে গেছে তা দয়া করে জানাবেন কি? পাঠক মো: মোস্তাফিজুর রহমানকে সবিনয়ে বলছি, দেখুন তো পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিক্রিয়াটিতে আপনিও প্রমাদমুক্ত থাকতে পারলেন কিনা? জুলফিকার শাহাদাৎ-এর ‘আকাশকে খোলাচিঠি’ নামের বইটি কিন্তু প্রমাদমুক্তই ছিলো। #

[দৈনিক ‘ভোরের ডাক’/ সাহিত্য সাময়িকী/ ২৩-১১-২০০৭]
... ... ...

- রণদীপম বসু, ঢাকা, বাংলাদেশ।

Web published:
http://www.mukto-mona.com/Articles/ranadipam_basu/Vanumatir_khel.pdf

No comments: