Friday, August 28, 2009

# টান নেই আঁচড় নেই শুধুই বিষাদ - ০৩ (কবিতাগুচ্ছ)


টান নেই আঁচড় নেই শুধুই বিষাদ - ০৩ (কবিতাগুচ্ছ)
-রণদীপম বসু


দেউটিতে বসে নেই কেউ
রণদীপম বসু

দেউটিতে বসে নেই কেউ, বসবেও না আর।
নির্জলা আকাশটাকে ভাঁজ করতে করতে করতে করতে
যে নাকি একদিন নিজেই এক হয়ে যেতো খাপখোলা আকাশ
সে এখন জলডুবি হ্রদের স্বচ্ছ অতলে ডুবে মেঘেদের মিতালি পাতায়,
মাছেদের নির্জন সঙ্গমচিহ্ণ খুটে খুটে উরুর জমিনে আঁকে বৃষ্টির ক্ষত।

সংসার উচ্ছন্নে যায়।
দেউটির শূন্যতা ডিঙিয়ে উন্মুক্ত কবাটে লাগে বাতাসের ঢেউ
এক চিমটি আর্দ্রতার সুখ ঘরময় ছোটাছুটি হাহাকার ছড়ায়
বসতে বলে না কেউ, বলবেও না আর
মোমরঙে আঁকাবুকো জ্যোৎস্নার আকাশ
বৃষ্টি নয়, রোদের উষ্ণতায় গলে ছিঁড়েখুড়ে নৈঃশব্দে হারায়।

দেউটিতে বসে নেই কেউ।
হয়তো বসবে এসে কখনো আবার কেউ
ইচ্ছের ভ্রুকুটি-জলে আবার ভাসাবে কেউ নতুন আকাশ
এ খবর রটায় না কেউ, তবু কেউ কেউ জেনে যায়
খিড়কি খুলে উঁকিঝুঁকি দেয়- কখন সঙ্গপ্রিয় পিঁপড়েরা
কুটিকুটি কেটেকুটে সার বেধে নিয়ে যাবে পুরনো আকাশ...!
(২৭-০৮-২০০৯)




আমার দক্ষিণা কই
রণদীপম বসু

মন্ত্র পড়ে অগ্নিরুদ্ধ করলেন তিনি
আগুনের লোলুপ জিহ্বা এ বাড়ি ছোঁবে না আর
ত্রিসীমায় মন্ত্রঃপূত যষ্টির অস্থির গণ্ডি এঁকে জানালেন-
কু-প্রভাব মুক্ত হলো এ বাড়ির প্রতিটা নিঃশ্বাস,
এবার মন্ত্রের দক্ষিণা দাও।

আগুনের হল্লামাখা গুণীনের রুষ্ট চোখে কেউ রাখে না চোখ
কিভাবে জানবে তবে অগ্নিমান মন্ত্রের অমূল্য দক্ষিণা কতো !
নিয়ে যাও ও-গুণীন তোমার যা ইচ্ছে তা-
শুধু রক্ষা চাই মুক্তি চাই বংশের সুখ্যাতি চাই
ভিটের আদরমাখা দুচোখে নিদ্রা চাই
তোমার মন্ত্রের দোহাই শুধু এটুকু ভিক্ষা চাই।

এই নাও জষ্ঠি আমের গাছ, ঘাটলাভরা পুকুরের খলবলে মাছ
ধবলি গাইয়ের বাট যত পারো নাও দুধ, ফসলের হাসিমাখা
ভাড়ারের চাবি আছে, পৈত্রিক সিন্দুক এই, আর কী কী চাও বলো ?
পিতৃপুরুষ সাক্ষী, পুঁথির অক্ষর গুনে যতগুলো মুদ্রা চাও
দিতে পারি তাও, তবু...

কিছুই চাই না তার !
গুণীনের লুব্ধ-চোখে গেঁথে থাকে এ বাড়ির দু’দুটো আকাশ-
‘ও গুণীন, আমার দক্ষিণা কই ?’
(২৭-০৮-২০০৯)



অনেক ঘুমের দেনা
রণদীপম বসু


খেলাপির কৃষ্ণখাতায় সাক্ষরিত নামের বানানে ভুল ছিলো না,
ভুল ছিলো না স্তুপীকৃত বকেয়ার অংকেও-
অনেক ঘুমের দেনা পড়েছিলো তাঁর।

লালঘুম নীলঘুম চিকন সবুজ ঘুম
কতোশতো নাম আর রঙের বাহারে মোড়া
কলাপাতা চোখে চাওয়া কিশোরী কিশোরী ঘুম
কুয়াশার ঝাঁপ খুলে হঠাৎ বেরিয়ে আসা সতেজ তরুণীঘুম
হুক-খোলা যৌবনা দুধারে প্লাবন-ডাকা সর্বনাশা ঘুম
জলঘুম চিনিঘুম উতলা-বেহুশ ঘুম তিক্তবিরক্তঘুম
বিগত স্মৃতির ভারে ন্যুব্জদেহ ভগ্ন-ধুসর ঘুম
এতোসব ঘুমের পাথর কেটে সময়ের ছেনি-কোপে
কিসের আদল খোঁজে একবুক নির্ঘুম চোখের আকাশ ?

একজোড়া হাতের অন্বিষ্ট পারে মুছে দিতে লক্ষকোটি চোখের শিশির
বিশ্বস্ত পাঁজরে ঘেরা এক বুক উদ্ভ্রান্তি মুহূর্তেই ছুঁতে পারে ডানার সাহস
যতই দীর্ঘ হোক এক জোড়া পায়ের অঢেল স্রোত
অনায়াসে গুনে যায় অসংখ্য গুণকে বাঁধা গ্রন্থিময় পথের নিঃশ্বাস
কটিবন্ধে ঝুলে থাকা অনড় প্রতিজ্ঞা পারে ভেঙে দিতে প্রচল বন্ধন সব
একটি আকাশমুখ নাক কান চোখ গাল চিবুক কপালের ভাঁজে
আশার অমিত মুখে গেঁথে রাখে জীবনের সংগুপ্ত মন্ত্রের স্বর-
আজন্ম ঘুমের পাথর কেটে
কেটে কেটে যে আদল গড়তে গড়তে সে জমিয়েছে ঘুমের দেনার স্তুপ
তা কি আর অপরিশোধ্য হয় ? বাড়ন্ত ও অবহ দেনার ভারে
শেষমেশ পাথরই বন্দী হয় পাথরের হাতে !

রয়ে গেলো অঙ্কুরের অসমাপ্ত মুখ-
একদিন কালঘুম ডাক দিলো তাঁকে।
(৩১-০৮-২০০৯)
[sachalayatan]



ঘুম তুই যাবি যা...
রণদীপম বসু

চৈতের ঘুমগুলো হঠাৎ অনার্য হাওয়ায় উড়ে যায়
ছিটেফোটা খড়কুটো সজোরে জাপটে ধরে পড়ে থাকি-
ঘুম তুই যাবি যা, যেখানে সেখানে খুশি যা...

আমি তো উড়বো না কখনোই, কোথাও পারবি না নিতে
বনলতা না-ই থাক, আমার তন্দ্রিতা আছে
ভুল হাতে ভুল কালে তাকেই টংকার দেবো,
শূন্য খোড়লে জেগে একটাই তো জন্মের ফারাক
ইনিয়ে বিনিয়ে দেখিস কাটিয়ে দেবোই ঠিক

ঘুম তুই যাবি যা, যেখানে সেখানে খুশি যা...
যাবিই তো ! শেষমেশ তুইও নির্ঘুম হলি...!
(২১-০৯-২০০৯)




      ধ্বংসস্তুপ
    রণদীপম বসু

...
বুঝতে পারো
তুমি চেয়ে আছে কোন্ জাতিস্মর চোখে ?
এক চিলতে পুকুর নয়, দু-দুটো ধ্বংসস্তুপ
ধ্বসে যাওয়া জনপদ ফুঁড়ে না ফেরার ধোঁয়া ওঠে এখনো
উড়ে যায় গন্তব্যহীন অনিবার্যতায়।

বসতের অখণ্ড স্বভাবে ফের গড়ো যদি
আর কোনো বৈশালির বুক, অভিন্ন নগর
ফিরে পাওয়া এক ছোপ ঘা-চিহ্ণ-সুখ
নিষাদের তূণে তূণে যেতে পারে ফিরেও আবার,
কেউ জানবে না তা।

ভেতরে হাত দাও, দেখো, তুমি নও
তোমার ও-চোখ শুধু চেয়ে আছে এই জাতিস্মর চোখে-
দৃষ্টিহীন
স্মৃতি আর বিস্মৃতির সবুজ উঠোনে ঘেরা
দুই ডুব কালো কষ্টগহ্বর-
অসম্ভব নীল হয়ে আছে...!
(১৪-১০-২০০৭)
 ...

No comments: