Thursday, July 22, 2010

অদৃশ্য বাতিঘর--১২ (কবিতাগুচ্ছ)


অদৃশ্য বাতিঘর--১২ (কবিতাগুচ্ছ)
 -রণদীপম বসু
...
| আহত লিরিক |
ধরো যদি একদিন কোন এক চন্দ্রাতপ রাতে
অকস্মাৎ মরে যাই আমি
কাঁদতে এসো না কেউ–
কাজ নেই আতর চন্দন মেখে, অথবা গোলাপ;
কেবল বিক্ষত হৃদয়টা আমার খুলে নিয়ো
উদ্ভ্রান্ত এ শরীর থেকে।

কেউ যেন না-পোড়ায় তা
না-দেয় কবর কিংবা না-ভাসায় জলে।
যা খুশি করো এই শরীরটাকে
কিছুই বলবো না আমি–
শুধু অভাগা হৃদয়টাকে সযত্নে তোলে ঠিক
বসিয়ে দিয়ো ওই হৃদয়হীন পাথর রমণীর বুকে–
আমৃত্যু জ্বালায় জ্বলে যেনো সে বুঝতে পায়
হৃদয়জ মানুষের দুর্বিষহ কষ্টের ক্ষরণ।



(মে, ১৯৯৮)


| অবিরাম শ্রাবণ আকাশ |
গভীর শীৎকারে গলে বৃষ্টির ধারাপাতে
যুবতী মেঘেরা শুধু জেনে যায়
আকাশের যৌবন উত্তাপ;
রাত্রির নির্জনে অচেনা আঁধার জড়িয়ে বুকে
আপন যৌবন খোঁজে আত্মমগ্ন মানুষের মতো।

মানুষ আর বৃক্ষে যোজন তফাৎ
তবু একাকি নির্জনে এলে
বৃক্ষকে জড়িয়ে কাঁদে নিমগ্ন মেঘেরা আর
বুকের গভীরে জাগে অবিরাম শ্রাবণ আকাশ।

(২০-০৭-২০০১)


| বহমান তুমি নদীর মতোই |
তুমি তো নদী নও
তবু তোমার গভীর শরীর থেকে জেগে ওঠা
ছলাৎছল শব্দে
প্রতিরাত জেগে ওঠি আমি, বারবার
মনে হয় কে যেনো বেয়ে যায় দাঁড়
বুঝি গন্তব্য জানা নেই।
দাঁড়ের শব্দে কাঁপে নদী
নদীর চলার মোহে ভেঙে যায় কূল
কুলত্যাগী রমণীর সিঁথিও নদীর মতো
বিস্ময়ের প্লাবন জলে
ধুয়ে যায় অভ্যাসের দাগ।

তুমি তো নদী নও
তবু বহমান তুমি নদীর মতোই–
ছলছল্ ছলাৎছল, ভাঙে আর ভেঙে যায়…।

(২১-০৯-২০০৫)


| একগুচ্ছ অণুকাব্য |

(১)
নশ্বর পৃথিবীতে সবকিছুই একদিন
হয়ে যাবে লীন
সবারই পাওয়ার সীমা থাকে জানি
তবু তোমাকে চাই সীমাহীন।

(২)
কত কথা সাজিয়ে রাখি খাপছাড়া এই মনে
তাজা কথা বাসী হয় মিথ্যে প্রহর গুনে।

(৩)
বোবা মুখের বলা কথা এতোই অসার
ফসকে যাওয়া কথাগুলো
ফিরে না যে আর।

(৪)
স্বপ্ন তুমি সত্য তুমি, তুমি কুয়াশা
তুমি আমার সকল আশা
তুমিই নিরাশা।

(৫)
এক পলকে নাচার হলো একটি বোকা মন
চিনলো না সে ফাঁসির আঁচল
মৃত্যু-তারিখ-সন।

(৬)
নিয়ম গেলো নিয়ম বলে যতোই চেঁচাও মিছে
অনিয়মটাই নিয়ম হলো
নিয়ম ভাঙার ভয় পালালো
পথের দিশা কুড়িয়ে পেলো ফেরারি সব ইচ্ছে।

(০৭-০৫-১৯৯৩)


| এখানে যুদ্ধরা আসে বারবার |

এখানে এই বিপণ্ন লোকালয়ের শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো
যুদ্ধকে চায়নি কখনোই, ঘৃণার মতো;
তবুও উদ্ধত যুদ্ধরা এসে
হামলে পড়েছে বারবার
অনিবার্য নিয়তির মতোই- বিভীষিকাময়।

যুদ্ধ কোন সমাধান নয়,
ছিলো না কখনো কোথাও, তবু
শালিকের মতো দোয়েলের মতো
আমাদের নিষ্পাপ শিশুদের আগামীর
উজ্জ্বল শস্য-ক্ষেত্রগুলো
কী ভীষণ লণ্ডভণ্ড হবার আগেও
এখানে এই বিধ্বস্ত লোকালয়ের নির্বিরোধী মানুষগুলো
যুদ্ধকে চায়নি কখনোই
দেখেনি এমোন হিংস্র আর ভয়ঙ্কর রক্তপাত কোনো;
অথচ এখানে যুদ্ধরা এসেছে বারবার
তার বীভৎস অবয়ব নিয়ে।

মানুষ আর যুদ্ধ পরস্পর পরিপূরক নয় কখনোই
এবং এই মাটিলগ্ন মানুষগুলো কখনো চায়নি তাও;
তবু এই নদী বিধৌত লোকালয়ে দুঃসহ যুদ্ধরা আসে,
ফিরে ফিরে আসে বারবার…।

(১৬-১২-২০০৫)


| সালামের বাড়ি |

যে কেউ এই লক্ষণপুর এলেই
সালামের বাড়িটা দেখে যান।
মাতুভূঁইয়া সড়ক-সেতুর গোড়া ঘেষে নেমে যাওয়া মাটির রাস্তা
কিছুটা এগিয়ে গেলে
প্রাইমারি ইস্কুল আর শহীদ মিনার ডানে রেখে
সমকোণে বেঁকে গেছে পথ
আরেকটু এগুলেই ভাঙাচোরা গ্রামীণ বসতির ফাঁকে
কেমোন জীর্ণ এক অহঙ্কার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
সালামের বাড়ি– তাঁর প্রিয়তম জন্মের ভিটা।

একেবারে নির্জন নয়–
একমাত্র বাসিন্দা সহোদর এক, তবু খাঁ খাঁ শূন্যতারা
মনে হয় চারিয়ে বেড়ায় খুব–
এ বাড়ির অলিন্দে ছায়ায় ছায়ায়।
ছোট্ট পাকা ঘর, বোঝা যায় বয়েসটা বেশি নয়
আদিটা হারিয়ে গেছে, তবু অনায়াসে চিনবে যে কেউ–
সিমেন্টের শিল্পীত বাঁধনে লেখা– চক্রাকার অবয়বে
‘ভাষা শহীদ সালাম মঞ্জিল’।

মহান ‘একুশে’ এলে রুটিন প্রোগ্রামে আসেন কেউ কেউ
চট্টগ্রাম-নোয়াখালী মহাসড়কের পাশে
সারি সারি গাড়ি রেখে
রথি মহারথি আর পায়ে হাঁটা সাধারণের ভীড়ে
ফুলে ফুলে ঢেকে যায় মিনারের বেদী–
আর সেই সাথে ভাঙাচোরা ক্ষতাক্ত অন্ধকার সব।
স্মৃতির মিনার ঘিরে অচিরেই বসে যায়
ছোটখাটো যেনো বা গ্রাম্য মেলা-ই এক
আগতদের আগ্রহের মতোই অস্থায়ী ভীষণ।
তারপর কেউ কেউ সালামের বাড়িটাতে ঢুঁ মেরে
ফিরে যায় গন্তব্যে যার যার…।

দুপুর গড়িয়ে গেলে পরিত্যক্ত বেদীটার মতোই
পড়ে থাকে মৃত কোলাহল সব–
এবং অনাগত বছরের স্তব্ধতায় ডুবে যায়
সালামের বাড়িটাও ফের।
হয়তো বা মাঝেমধ্যে কেউ এসে নিপাট এ শূন্যতাকে
নাড়ায় খানিক, কাটে না শূন্যতা তবু;
শুধু নড়ে ওঠে লক্ষণপুর, অধুনা এ সালাম নগর।

(১৭-১২-২০০৫)

No comments: