Tuesday, April 29, 2008

# যে ডায়েরীটা লেখা হবে না আর...(০১)






যে ডায়েরীটা লেখা হবে না আর...(০১)

(০১,এপ্রিল,১৯৯৩)


যেখানে পাওয়ার আনন্দ, হোক সে বেদনা
সেখানেই হারানোর ভয়।
গুমরে ওঠে অনুরাগ অস্ফুট ব্যথায় ;
মিথ্যে নয় পৃথিবীটা মিথ্যে নয় মানুষের মন,
আমিই নিথর কেবল।



তোমার স্নিগ্ধ ভালোবাসাকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারি না কখনো ; পারবোও না। তাইলে সে যে আমার নিজকেই ফিরিয়ে দেয়া হবে। তাইতো চোখের তারায় স্বর্গ নামিয়ে তোমার ভালোবাসার রজনীগন্ধা বাড়িয়ে দিলে যখন, জানলে না, কি এক অদ্ভুত খেয়ালের দিকে ছুঁড়ে দিলে আমাকে, তোমার এই পাপড়ির বুকেই আমাকে উন্মুক্ত করতে হবে- মেলে ধরতে হবে আমাকে। কিন্তু আছে কি এমন কিছু, এক বুক শূন্যতা ছাড়া ? যাকে কিনা ঈর্ষণীয় সমৃদ্ধ তুমি অনায়াসে বুকে টেনে নিলে, ভালোবাসায় সিক্ত করে আমাকেই চিনিয়ে দিলে- কে আমি !

রূপা, মানুষ নাকি সারা জীবন নিজকেই খুঁজে ফেরে। কেউ খুঁজে পায়, কেউ পায় না। এভাবেই একদিন চলে যায় সবকিছুর আড়ালে। যারা পায়, তাদেরকে আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যবান মনে করি, শ্রদ্ধা করি। আর যারা পায় না, তাদের জন্য দুঃখ হয় খুব, তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য।

এমন একটা দুঃসহ সময় আমাকেও পুড়িয়েছে খুব। এই নির্দয় জ্বলনে উদ্ভ্রান্ত আমি ছটফট করেছি একা। অথচ মজার ব্যাপার কি জানো ? এই জ্বলন্ত সময়টাতেই আমার পরিপার্শ্ব অর্থাৎ আমার জানা অজানা চেনা অচেনা বন্ধু বান্ধব সবাই আমাকে স্বীকৃতি দিলো হাস্য-পরিহাসপ্রিয় সতেজ সপ্রাণ একজন জলি ছেলে বলে ! হায়রে বিচিত্র পৃথিবী !

আমার সেই দুঃসহ সময়, কী ভালো লাগে ভাবতে ! চলোনা, একটু কল্পনায় ভেসে উঠি। কল্পনা বললাম বলে আবার ভেবো না যেন ঘটে যাওয়া বাস্তবতার এতটুকুও বাইরে। তোমার মনে পড়ে কি, কোন এক ধূসর এবং রূপালী সন্ধ্যার কথা ?

বিয়ে সম্পৃক্ত কোন এক অনাড়ম্বর সন্ধ্যায় ক্ষীণ হয়ে যাওয়া পরিচিতির সূত্র ধরে খুবই সাধারণ যে তরুণটি অকস্মাৎ অবাঞ্চিতভাবেই তার বেসুরো উপস্থিতি জানান দিলো, তাতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্যে সম্পূর্ণ বেমানান পরিচ্ছদে হাজির হওয়া আপদ দেখে উপস্থিতজনদের ফিটফাট চেহারায় বিরক্তির ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক ছিলো। তা সত্যি হয়েছিলো কি না জানি না বা জানা সম্ভব হয়নি। কেননা তা বুঝার আগেই এক প্রাণোচ্ছল মেয়ের উপস্থিতি এই তরুণকে এসব ঠুনকো ব্যাপারের অনেক উর্ধ্বে তুলে নিয়ে গেলো। মনে হলো পৃথিবীটা কত সুন্দর এবং নিষ্পাপ ! তখনও কি এ তরুণ ভাবতে পেরেছে যে কী দুঃসহ সময় সমাগত ? নিষ্পাপ সুন্দরের তীব্র রশ্মি ঘণীভূত হচ্ছে তরুণের নিরেট শুকনো অস্তিত্বে, জ্বলে উঠার অপেক্ষায় ? কোন তরুণ যুবকের সামনে একটি মেয়ের স্বাভাবিক উপস্থিতি খুবই সাধারণ ব্যাপার একটা। অথচ এখন ভাবলে মনে হয় এটা সাধারণ কোন ব্যাপার ছিলো না, অনেক অনেক অনেক বড় কিছু। রূপা, আমি বিধাতার বাস্তব অস্তিত্ব সম্পর্কে বরাবরেই সন্দিহান সে তো জানোই, তবু বিধাতা শব্দটি কিছু একটা অর্থে ধরে নিয়ে বলতে হয়, বিধাতা বড্ড রসিক বটে !

খুব স্বাভাবিকভাবেই আন্দোলিত মনে রাত্রির প্রথম বুক চিরে চিরে ফিরেছিল তরুণটি। তখনও নিস্তরঙ্গ অস্তিত্ব এমন সাধারণ ছিলো বলেই হয়তো আজও সে তরুণ জানে না ঐ মুহূর্তে সে নিটোল সুন্দরের ঔজ্জ্বল্যে আলোকিত ছিলো কি না। ফেলে আসা দিনগুলোতে পারিপার্শ্বিক কতজনেরই তো স্বাভাবিক সংস্পর্শে এসেছে সে, তাই অতি সাধারণভাবেই এতেও স্বাভাবিকতা ক্ষুন্ন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু...? হাঁ, একটা কিন্তুই এই বিশাল পৃথিবীটাকে ওলট-পালট করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তরুণের পৃথিবীটা তখনও আগের মতোই স্বাভাবিক থাকলেও কোথায় যেন একটু ছন্দপতন ঘটে গেলো সে বুঝতে পারলো না। তবু কি যেন একটা কিছু হারিয়ে গেছে অথবা নেই, এ ধরনের একটা সুক্ষ অনুভূতি কোথায় যেন বিঁধতে লাগলো। ঐ তরুণ তো তখনও খুবই সাধারণ একটা ছেলে মাত্র। অতশত বোঝে না সে। বোধ করি মানুষের জীবনে প্রথম নিঃসঙ্গতার অবচেতন উপলব্ধি এমনি করেই আসে, অজান্তে। যার উৎস সুনির্দিষ্ট থাকলেও সে মুহূর্তে কেবলই ধূয়াশা !

আজ এই নিঃসঙ্গ অথবা আপাত নিঃসঙ্গ মুহূর্তে মেয়েটি থেকে অনেক দূরে বসে সেদিনের সেই তরুণটি কি ভাবছে জানো রূপা ? ভাবছে সে, সেই দিন সেই মুহূর্তে কেন এক উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়েছিল নিজেরই অজান্তে, সুন্দরের ছোঁয়ায় ! নইলে এরপর থেকে সে কেমোন আনমনা হয়ে যেতো না যখন তখন। বিশ্বজগতের স-ব কিছুতেই কী যেন খুঁজে বেড়াতো সে প্রাণোচ্ছলতায়। অথচ জানতো না কী খুঁজছে। ঝলসে ওঠা তারুণ্যের ঠিকরে পড়া আলোর উৎস কোন্ সে শিখা, তা জানে না সে। বুঝতে পারে পৃথিবীটা কেন জানি খুব আনন্দময়। কী জানি খুঁজে সে, কখন কোথায় কীভাবে তা-ও জানে না। কী বোকা সে দেখো, প্রায়ই মেয়েটির মুখোমুখি হচ্ছে এবং তারুণ্যে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে, ছাত্রত্বের শ্রেষ্ঠ সময়টা মিছিল মিটিং কবিতা গান খেলাধূলা আড্ডায় সরব উপস্থিতিতে শ্রেষ্ঠতম হয়ে ওঠছে। অথচ সে জানলো না কোন্ সে আলোয় আলোকিত ! সাহসী মাঝি আনন্দে উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা, গন্তব্য জানে না, চোখ তার আকাশের নীলে। তাই সে জানলো না এটা মাঝ দরিয়া। কিন্তু যখন সে জানলো, দৃষ্টি তার নেমে এলো নীচে যেখানে সে আছে। যখন সে বুঝলো এটা মাঝ দরিয়া, চমকে ওঠলো, সমস্ত অস্তিত্ব অকস্মাৎ আলোড়নে স্তব্ধ হয়ে গেলো ! আসলে ঠিক বোঝাতে পারছি না রূপা, এ কেমন প্রচণ্ড অনুভূতি ! কেঁপে ওঠলো তরুণ মাঝ দরিয়া দেখে নয়, দরিয়ার বিশাল বুকের অনন্ত কষ্টের আয়নায় তার বেমানান হাসির অসারতা দেখে, নিজের অস্তিত্বের নগন্যতা উপলব্ধি করে !

মনে পড়ে রূপা, সেই দিনটির কথা ? উদ্দাম তরুণের সময়গময়হীন অবাধ্য যাতায়াতের উচ্ছলতা হঠাৎ থমকে গেলো যেদিন। চমকে ওঠলো, এ কী দেখছে সে ! এ-তো সেই মেয়ে নয় ! একটা ভয়াবহ কষ্টের পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে সামনে। চোখের পাথর দুটি বেদনায় গলে গলে ঝরছে। কী এক অবরুদ্ধ ব্যথায় গুমরে গুমরে ওঠছে মেয়েটি। না না, মেয়ে নয়, তরুণী ! তাও নয়। হঠাৎ কী-যে হয়ে গেলো পৃথিবীটায়। মুহূর্তের প্রচণ্ড আলোড়নে এমন এক ভয়াবহ ভাঙাগড়া হয়ে গেলো, কেউ কিছু বুঝতে পারলো না। নিমেষে এক চিরায়ত পুরুষের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠলো শাশ্বত এক নারী, যে নাকি হয়ে আছে বেদনায় বিষে নীল। পৃথিবীর সমস্ত আনন্দের মুখে কে যেনো এক ছোপ কালি মেখে দিলো। জগতের সমস্ত গান বেহাগে মুড়ে গেলো। যুবকে রূপান্তরিত তরুণ নিজের প্রচণ্ড অসহায়ত্বে নিথর হয়ে গেলো। ঐ যুবকের বুকের ভেতরে কী ঘটে গেলো নারীটি তা বুঝলো না। সে শুধু নিজেকে আড়াল করতে চলে গেলো অন্তরালে।

রূপা, বিমূঢ়তারও একটা শেষ আছে। কিন্তু এ যে হারিয়ে যাওয়া নিজেকে ভয়াবহভাবে ফিরে পাওয়া, একেবারে শুদ্ধভাবে। জানো, যুবকটির তখন কি করতে ইচ্ছে হচ্ছিল ? একেবারে হাউমাউ করে কাঁদতে। প্রচণ্ড কষ্ট আর আনন্দে হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে পৃথিবীটাকে ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল তার। এ আমি কী দেখলাম ! আমার হাজার বছরের জন্ম জন্মান্তরের অস্তিত্বের চির পরিচিত খুবই আপন অংশটিকেই তো খুঁজে পেলাম। কিন্তু হায় ! এ যে আমার ধরা ছোঁয়ার একেবারে বাইরে ! অনেক অনেক যোজন দূরে! যেনো কয়েকটা জীবনের দূরত্ব। পাথর চোখে তীব্র জ্বালা হচ্ছিল। বিশ্ব চরাচরের সব কষ্ট নিরেট পাথর হয়ে এই ভাঙা বুকটাতে চেপে বসলো।

যুবকের পৃথিবী বোঁ বোঁ ঘুরছে। সবকিছু একাকার। সে নীলকণ্ঠ হবে, ঐ নারীর সমস্ত কষ্ট শুষে নেবে। ওকে তো ঐ কষ্টে মানায় না ! নির্মল হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে পৃথিবীকে আন্দোলিত করার বদলে এমোন পাথর বিষন্নতা ! না না, এ হতে পারে না। যুবক তার সর্বস্ব বাজি ধরতে উন্মুখ। কিন্তু...? ঐ নারী কার কষ্ট বুকে ধরে এমন নীল ? জানো রূপা, যুবকটি সেদিনই প্রথম কষ্ট কী তা বুঝতে শিখলো। সেদিন সে নারী তার কিছু কষ্ট ঐ যুবককে বইতে দিলো না বলে যুবকটি আহত হলো খুব ; কিন্তু বুঝতে দিলো না। তখনই সে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠলো। তারপর থেকে সে যুবক নতুন নতুন কষ্ট বানিয়ে বয়ে বয়ে নিজকে যোগ্য করে তোলার চেষ্টায় মেতে ওঠলো। হয়তো মেয়েটির কষ্টও বাড়তে লাগলো আরো। আশ্চর্য ক্ষমতায় একা একা বয়েও চললো। অথচ এমন স্বার্থপর মেয়ে, যুবকটিকে তার সামান্য কষ্টও বইতে দিতে নারাজ। যুবক রাগ করে, অভিমান করে, তবুও একগুঁয়ে মেয়ে বুঝতেই চায় না, এই কষ্ট বইতে না দেয়ার কষ্টের ভার যে তার বুকে আরো ভারি পাথর হয়ে সারাক্ষণ চেপে থাকে। যুবকটি তো এতো স্বার্থপর নয়, মেয়েটির মতো। সে কষ্টের ভাগাভাগিতে বিশ্বাসী। সমানে সমান।

রূপা, যুবকের গল্প বলতে পারছি এজন্যেই যে, সে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিতে পারে নির্দ্বিধায়, অসঙ্কোচে। কেননা তার আর হারাবার ভয় নেই। যা হারাবার, অনেক আগেই তা হারিয়ে ফেলেছে। এবং সেই হারানো জিনিসটাকে মেয়েটির কাছে খুঁজে পেয়ে ওরই জিম্মায় রেখে দিয়েছে যোগ্যতম জায়গা বানিয়ে। সে এখন শূন্য শারীরিক খোলশ মাত্র। আর মেয়েটির গল্প বলতে পারছি না, মেয়েটি যুবকের চোখে এখনো কুয়াশা। নিজেকে গুটিয়ে রাখা একটা ব্যথার পিণ্ড। প্রকাশিত হতে দ্বিধান্বিত।

এবার বলো তো, যুবকটিকে যে এতো কষ্ট দিচ্ছে, কী সাজা প্রাপ্য হতে পারে তার ? কষ্টসহ মেয়েটিকে তুলে এনে যুবকের শূন্য বুকের মধ্যে ঠিক আটকে দেয়া, তাই নয় কি ?

“ রূপা, তোমার বুকের বাঁ-দিকে হাত রাখো ; একটু নীচে। টের পাচ্ছো ? কী পাচ্ছো ? ওটা আমার বসত। অনন্ত আমার একমাত্র ঠিকানা !”

// দিলমে রহ দিলমে,
কেহ্ মেমার এ কজাসে অবতক
এ্যায়সা মতবু মঁকা কোঈ বনায়া নহ্ গয়া
//

‘ হৃদয়ের মধ্যে থেকো, হৃদয়ের মধ্যে।
কারণ ভাগ্যনির্মাতা আজ পর্যন্ত
এর চেয়ে মনোরম বাড়ি তৈরি করতে পারেন নি।।’


(- মীর তকী মীরের গজল থেকে -)


চলবে...

ভূমিকা পর্ব (০০):
পরের পর্ব - (০২):
R_d_B

# যে ডায়েরীটা লেখা হবে না আর...(০০)






যে ডায়েরীটা লেখা হবে না আর...(০০)


[লেখকের ভণিতা:

কিছু কথা থাকে গোপন, কিছু কথা একান্ত ব্যক্তিগত, যা সর্বসমক্ষে প্রকাশের নয়। বিখ্যাতদের এরকম অজ্ঞাত কথাও কালের দরজা পেরিয়ে হঠাৎ বিখ্যাত হয়ে ওঠে। কিন্তু অখ্যাতদের সে রকম কথা কি গ্রাহ্য করি আমরা ? না কি খুঁজে দেখি ?

এটা একটা সত্যিকারের ডায়েরী। অথবা প্রিয়তমাকে লেখা ধারাবাহিক পত্রগুচ্ছ বা সমার্থে পত্রপঞ্জিও বলা যায়, ডায়েরীতে আঁকা। সেকালে যক্ষের বিখ্যাত আকুতিগুলো বয়ে নিয়েছিলো তার মানবিক মেঘ, মেঘদূত হয়ে। আর একালে...?

অনুভবের স্পন্দন না পেলে কখনোই উপলব্ধির পূর্ণতা আসে না। আর এই অনিবার্য ব্যর্থতাই এমন একটা শুভ্র শুদ্ধ অনুভূতিকে সহসাই খাটো করে দিতে পারে অনায়াসে অজান্তে। তাই ভালোবেসে যারা প্রণয়-যন্ত্রণায় কখনো ছটফট করেন নি তাদের হয়তো এটা না পড়লেও চলবে। কিন্তু এটা সবাই মানবেন যে, ভালোবাসা, সংজ্ঞাহীন এক নীলাভ-কষ্টের নাম। এই ভালোবাসার অমিয়-গরলে ডুবে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়া চিরায়ত এক প্রেমিক মনের শাশ্বত আকুতি এখানে অক্ষরে অক্ষরে নীল হয়ে আছে। এ নীল শুধু কি নীল? তা নয়। রক্ত-মাংশ ভেদ করে গভীর গোপন থেকে ওঠে আসা তেতে ওঠা সপ্তবর্ণা নীল!

কোত্থেকে জানবো আমরা, ভালোবাসা প্রেমিককে সত্যিই নীলকণ্ঠ করে কী না ? মীর তকী মীর, জালালুদ্দীন রুমী, হাফিজ, মীর্জা গালীব বা ওমর খৈয়ামের মতো দিওয়ানা শায়েরী যার শতচ্ছিন্ন জগতে শর্তহীন আশ্রয় হয়ে যায়, বস্তুগত শেকড়ের আশ্রয় তাকে কী-ই-বা দিতে পারে ?

ডায়েরীটা যার আয়ত্তে এখন এবং যাকে উদ্দেশ্য করেই এটা লেখা, তিনি যে কোন্ বিশ্বাসে এটা আমার হাতে তুলে দিলেন, জানি না। তবে তা যোগ্য পাঠকের সামনে বস্তুনিষ্ঠভাবে যে অকপট স্বচ্ছতায় হুবহু প্রকাশের চেষ্টা করেছি, এর সবটুকু ঔদার্য্য ও কৃতিত্বও তাঁরই। তাঁর এই সাহসী ভূমিকার জন্য যুগপৎ বিস্ময় ও অভিনন্দন রইলো। তবে হাঁ, আশ্চর্যজনকভাবে এই একান্ত ডায়েরী লেখকের সম্মতিও রয়েছে এখানে।

স্বাক্ষরিত প্রতিটা পত্রপঞ্জির শেষে শুধু প্রথমটাতে ০১ এপ্রিল ১৯৯৩ থাকলেও পরবর্তী কোনটাতেই সন তারিখ উল্লেখ নেই। তবে ওই বছরের শেষার্ধেই ডায়েরীটা যে তার সঠিক গন্তব্যে পৌঁছেছিলো এটা নিশ্চিৎ। কিন্তু যে প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত তাড়া করবে আমাদের, তার উত্তরে শুধু এটুকুই বলবো- প্রেমের স্বার্থকতা মিলনে, পূর্ণতা বিরহে ; তবু প্রেমটাই সত্যি। এর বেশি কিছু থাকলে তা সহৃদয় পাঠকের জন্যই তোলা রইলো।

আসুন আমরা এবার ডায়েরীতে প্রবেশ করি...


--- লেখক।]



চলবে...

প্রথম পর্ব (০১):
R_d_B

Friday, April 25, 2008

# অদৃশ্য বাতিঘরের খোঁজে...




ও বন্ধু আমার...
-রণদীপম বসু


প্রথম দেখাতেই তাকে খুব ভালো লেগে গেল আমার। এই ভালো লাগাই যে আসলে আমার অব্যক্ত ভালোবাসার স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতির প্রাথমিক প্রকাশ ছিল, তা বুঝে উঠতে পারিনি। এমন অনির্বচনীয় উপলব্ধিজাত অভিজ্ঞতা আমার এটাই প্রথম।
তার সঙ্গে দেখাটাই ছিল নাটকীয়। তখন আমি কেমিস্ট্রিতে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছুটিছাটায় বাড়িতে খুব একটা আসা হতো না। সেবার কি একটা ছুটিতে যেন বাড়িতে আসি। আর বাড়িতে এলেই ষোলঘর থেকে বিকেলের সোনা রোদে সেকালের ছায়াসবুজ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে উকিলপাড়া হয়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে এসে ঢু মারা আমার নিয়মিত অভ্যাস। দিনের পত্রিকাগুলো উল্টেপাল্টে শেষে থরে থরে সাজানো বইয়ের আলমিরাগুলো চষে বেড়ানো প্রিয় বইটির খোঁজে। তারপর সন্ধ্যা জমে এলে যথানিয়মে নিবন্ধন করিয়ে বইটি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়া। এদিক সেদিক বন্ধু-বান্ধবের ঠিকানায় ছোট্ট একটু আড্ডা মেরে রাত করে বাসায় ফেরা। একান্ত দুর্বিপাক না হলে এ অভ্যাসের অন্যথা খুব একটা হতো না।
সেদিনও এমনি লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ইচ্ছে হলো আজ একটু অন্য পথেই যাই। কালীবাড়ি রোডের পুরনো সহপাঠিনী শিপ্রার সঙ্গে দেখা করে হাছননগর হয়ে ফিরবো। বহু দিন পরে যাচ্ছি। শিপ্রাদের বাসার কাছে এসেও লোডশেডিংয়ের কারণে ঠাহর করে উঠতে পারছিলাম না। তবু ধারণা করে গেট ঠেলে ঢুকে পড়লাম এবং বিপত্তিটা বাঁধলো তখনি।
সুনামগঞ্জ শহরের এদিকটায় তখনকার সময়ে এমনিতেই খুব নিরিবিলি থাকতো। লোডশেডিং গাছগাছালি আর ভরা পূর্ণিমার আলো-আঁধারিতে বাড়ি ভর্তি এতো মানুষের নীরব সমাগমে থমকে গেলাম। অপ্রস্তুত হলাম আরো বেশি। ঘোর কাটিয়ে লক্ষ্য করতেই বুঝে গেলাম, সম্পন্ন হয়ে যাওয়া একটা অনুষ্ঠানের মধ্যে অনাহুত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই এসে পড়েছি আমি। মুহূর্তের ইতস্ততা কাটিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছি...; কাকে চাই ? বুঝলাম আমাকেই বলা হচ্ছে। আবছা আলোতে একজন বর্ষীয়ান ব্যক্তি 'আপনি কে' বলে হয়তোবা চেনার উদ্দেশ্যে যেভাবে ঘাড় থেকে গলাসুদ্ধ মুখটা আমার দিকে ঝুঁকে দিয়েছেন, তাতে বুঝা গেল তিনি দর্শন ও শ্রবণজনিত অতি ক্ষীণতায় ভুগছেন।
অতি সঙ্কোচে আমতা আমতা করে শুধু বলতে পারলাম, আমি...।
মুহূর্তেই উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠলো চারদিক। সারা বাড়ি জুড়ে সাজিয়ে দেয়া বর্ণিল বাতিগুলো মোহনীয় করে তুলেছে আশপাশ। এবং অভাবিতভাবেই সবচেয়ে উজ্জ্বল ঝলমলে চৌদ্দ-পনেরো বছরের প্রাণবন্ত মেয়েটি দেব-দূতির মতো পুরো সৌন্দর্য নিয়ে যেন আমাকে উদ্ধার করতে সামনে এসে দাঁড়ালো। না না, যাবেন না বলে হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো ঘরের মধ্যে। ফিরতিযাত্রার নতুন কনের সাজে সখি পরিবেষ্টিত শিপ্রার প্রশ্নবোধক দৃষ্টির সামনে অপ্রস্তুত আমার এই প্রথম খেয়াল হলো যে, অত্যন্ত সাধারণ লুঙ্গি-শার্ট আর জাম্পার পরা আমি এতোসব অভ্যাগতের মাঝে বড় বেমানানভাবে জড়োসড়ো দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সেই ডানাকাটা লাল পরীটার সাগ্রহ সকৌতুক দৃষ্টির আড়ালে একাধারে লজ্জিত ও ততোধিক আলোড়িত হচ্ছি। জানলাম তার নাম রূপা। শিপ্রার সেজ বোন ! এ বাসায় আমি একেবারে অপরিচিত নই। কিন্তু আমার কাছে তখন পৃথিবীর সুন্দরতম মেয়েটির উপস্থিতি কেন আগে চোখে পড়েনি, সেটাই অনির্ণিত প্রশ্ন হয়ে বাজতে লাগলো।
সেদিনের পর থেকে আমার বুকের গভীর বিশ্বে নিউটনের সূত্রগুলো সব এলোমেলো হয়ে গেলো। সুরমার পানি উল্টো বইতে শুরু করেছে তখন এবং হৃদপিণ্ডের আকর্ষণ বলের মধ্যে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বটাই যুক্তিহীনভাবে প্রভাব বিস্তার করতে লাগলো। লেখাপড়ায় অতি মনোযোগী যে ছেলেটি হল-হুস্টেল ছেড়ে মা-বাবার শত অনুরোধেও বাড়ির নাম নিতে ভুলে যেতো, সেই কি না বাড়ি আসার জন্য ঘন ঘন ছুটি পেতে লাগলো। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপারটা ছিল, এই তো একটা জরুরি কাজে বাড়িতে এসেছি, কালই চলে যাবো; ভাবলাম একবার তোমরা কেমন আছো দেখে যাই- আমার এ জাতীয় উক্তিগুলোর যথার্থতায় সেও সাগ্রহে প্রশ্রয় দিতে লাগলো। এই প্রশ্রয়ই প্রকারান্তরে আমাকে আরো সাহসী এবং তার মনটাকে ছুঁয়ে দেখার নেশাগ্রস্ততার ঘোরে আটকে দিল।
আমি বুঝতে শুরু করলাম, আমি তাকে প্রচণ্ড রকম ভালোবাসি। কিন্তু প্রকাশে অক্ষমতা, দ্বিধা অতিক্রম করতে পারি না। পাশাপাশি সে কি আমাকে ভালোবাসে ? এই অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা ভেতরে ভেতরে নীল করে দিচ্ছিল আমাকে। তবে বাইরে আমার হাসি-খুশি কৌতুকপ্রিয়তা ঠিকই বজায় থাকলো। ব্যাকগ্রাউণ্ডে ছাত্র হিসেবে খুব খারাপ নই, ব্যায়ামপূর্ণ শারীরিক সুস্থতায় ফেলনা নই, কিংবা ছবি আঁকা,গান গাওয়া, হালে কবিতা লেখা ইত্যাদির কিঞ্চিৎ সমাহারও রয়েছে। তদুপরি স্বেচ্ছাশ্রমী টিউটর হিসেবে মন্দ নই প্রমাণিত হওয়ায় এবং সর্বোপরি স্বভাব-চরিত্রে কুপ্রভাব দৃষ্ট না হওয়ায় তাদের গোটা পরিবারের কাছেই আমার বিশ্বস্ততা বা গ্রহণযোগ্যতা কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি। তাই হয়তো সুরমার আরো অনেক পানি গড়িয়ে যেদিন সে ঘরের নির্জনতায় তার মনোজগৎটাকে আমার হতবিহ্বল দৃষ্টির সামনে অক্লেশে উন্মুক্ত করে দিল, বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ফ্যাকাসে রুগ্ন এক অস্বস্তি নিয়ে আমি বিমূঢ় হয়ে গেলাম ! এমন আকস্মিকতায় প্রস্তুত ছিলাম না আমি।
ধর্মীয় বিশ্বাসে ও সংস্কৃতিতে ভিন্ন এক বেয়াড়া জেদি একরোখা তরুণ মেয়েটির কিশোরীবেলায় জোর করে তার বিশ্বস্ত ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছে ! নইলে যে, ছেলেটি তার সামনেই নিশ্চিত আত্মঘাতী হতো ! মানবিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ তরুণটি শুধু তার শিক্ষাগত ঘাটতিটুকু অন্য এক বিকল্প দিয়ে পূরণ করতেই এখন জাপান প্রবাসী হয়েছে। ছেলেটির নিশ্চিত ফিরে আসার দুঃসহ অপেক্ষকালীন সময়টায় আমার হঠাৎ এই সরব ও যোগ্য উপস্থিতি তাকে ইদানিং সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিয়েছে।
কেন আর ক’টা বছর আগে আমার সঙ্গে তার দেখা হলো না ! এখন কাকে ফিরিয়ে দেবে সে ! এই অক্ষমতায় তার যে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথই খোলা নেই ! চোখে বাধভাঙা পানির ধারা, অস্তিত্ব জুড়ে একটা ভয়ানক নিঃশব্দ ভাঙন প্রত্যক্ষ করে আমার বুকের ভেতরেও শেকড় ছেঁড়া প্রচণ্ড পাড়ভাঙার শব্দ শুনতে পেলাম। আশ্বস্ত করার কোনো ভাষা আমার জানা নেই। শুধু ওর ডানহাতটা টেনে নিয়ে সাদা মসৃণ কলমের মতো আঙুলগুলোয় আড়ষ্ট ঠোঁট ছুঁয়ে আমার শুভেচ্ছা এঁকে দিলাম। তারপর নিজেকে তীব্র ইচ্ছাশক্তি দিয়ে স্বাভাবিক রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে চালাতে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম।
প্রচণ্ড আশাবাদী একজন ব্যক্তিমানুষকে সে ঘরে টেনেছিল। বেরিয়ে এলো, ভাঙনের শব্দকাতর এক কবি ! পেছনে তার এক অদৃশ্য বাতিঘর। কেবল জ্বলছে-নিভছে...! # (অদৃশ্য বাতিঘর)

মনে পড়ে সমুদ্রের কথা...
অদৃশ্য বাতিঘর এক পেছনে নিমগ্ন রেখে
পেরিয়েছি ক্ষয়িষ্ণু বিকেল কতো
নোনাজল গায়ে মেখে তরুণী বৃক্ষ এক
দিয়েছিল সঙ্গ কেবল
এঁকেছিল বুকে তার আর কারো মন্থন ব্যথা।

এখনো ভুলে কোন জলাশয় এলে
ইতিউতি খুঁজে ফিরি বিপণ্ন বাতিঘর এক;
অদৃশ্য ক্ষরণ নামে মগ্নতার জলে
হায়, কোথায় সেই বৃক্ষ আজ?

সমুদ্রের কথা মনে পড়ে যায়...।
#

[যায়যায়দিন-এর বিশেষ ভালোবাসা সংখ্যা বৃহষ্পতিবার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৭-এ প্রকাশিত]
R_d_B
[amarblog]
[pechali]
[mukto-mona]
[sa7rong]
[Khabor.com]

Wednesday, April 23, 2008

# Collection of Arts and Images... (08)
























Images

# Collection of Arts and Images... (07)
























Images

# একজন মুসলিম কি অমুসলিমের জন্য শান্তি চাইতে পারেন না !




একজন মুসলিম কি অমুসলিমের জন্য শান্তি চাইতে পারেন না !

- রণদীপম বসু



একবার বয়োজ্যষ্ঠ হুজুরগোছের এক ব্যক্তিকে ‘স্লামালিকুম’ সম্ভাষণ করতে গিয়েই বিপত্তি বাঁধলো।

‘আস্ সালাম ওয়ালাইকুম...’। এর বাংলা তরজমাটা আমরা সবাই জানি- আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। কথাটার আক্ষরিক ও ভাবগত অর্থ এতো চমৎকার যে, ‘আদাব’ শব্দটিকে সে তুলনায় অর্থহীনই মনে হয়। যদিও ফারসি ‘আদাব’-কে আমি মোটেও ছোট করে দেখছি না, বরং এর সাথে আমাদের এই উপমহাদেশিয় সভ্যতার ইসলামী শাসন পর্বের রাজসিক সংস্কৃতির কৌলিন্য মিশে আছে। তবু আমি আদাব শব্দটিকে পারতপক্ষে ব্যবহার করিই না। সে তুলনায় চলমান অভ্যস্ততার কারণেই হয়তো ‘আস সালাম ওয়ালাইকুম’ বা এর গতিশীল অপভ্রংশ ‘স্লামালিকুম’ ব্যবহারে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যদিও বাংলার প্রতিই আমার পক্ষপাত সবচেয়ে বেশি। তবে আরবি কায়দায় বললে যেভাবে শান্তি বর্ষিত হয় সম্ভবত বাংলায় বললে বর্ষণটা সেভাবে হয় না।

চাকুরে হওয়ার সুবাদে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন কি ইউনিয়ন বা গ্রাম পর্যায়ে অবস্থানের বহু সুযোগ ঘটেছে আমার। ভৌগোলিক পরিবেশ ও জলবায়ুগত ভিন্নতা ছাড়াও শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মান আপেক্ষিক হওয়ার কারণে অঞ্চল ভেদে মানুষের চলন বলন চিন্তা চেতনায়ও যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। আর ধর্মীয় উপলব্ধিও যেহেতু এর সাথেই জড়িত, তাই এ ক্ষেত্রেও যথেষ্ট বৈচিত্র্য দেখা যায়। কিন্তু ধর্মীয় গোড়ামীর ক্ষেত্রে শিক্ষিত অশিক্ষিত আবহাওয়া জলবায়ু নির্বিশেষে অভিন্ন মিলই চোখে পড়েছে বেশি। এর রেশ ধরেই শুরুতেই যে সালাম সম্ভাষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে অনেক বিপত্তির সম্মুখিন হতে হয়েছে আমাকে। শুধু কি জন্মসূত্রে অমুসলিম হওয়ার কারণেই ?

আমার পরিচয় আগে থেকে জানতেন বলেই হয়তো সেই হুজুর সুযোগে আমাকে ধর্মের কিছু জ্ঞান বিতরণ করে দিলেন। একজন মুসলমানই কেবল আরেকজন মুসলমানকে আরবিতে এভাবে সালাম জানানোর অধিকার রাখেন। কে জানে, হবে হয়তো। সীমা লঙ্ঘনের অনৈতিক পন্থায় নাই গেলাম। কিন্তু মনের মধ্যে খুতখুতে রেশটা রয়েই গেলো। আরেকদিন সেই হুজুরকে সামনে পেয়েই ডান হাত কপালের ডান পাশে ঠেকিয়ে সজোরে বললাম- ‘আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ কিন্তু এবারে বিপত্তি বাঁধলো অন্যত্র। তিনি হয়তো ভাবলেন তাঁকে কটাক্ষ করা হয়েছে। যদিও এরকম কোন ইচ্ছা বা অভিরুচি ছিলো না। তারপরেও এতোবড়ো বাক্যটাকে সেরকমই মনে হলো। তিনি অনেকটা ক্ষুন্ন মনে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। হয়তো আমার সম্পর্কে তাঁর স্বনির্মিত ধারণাটাও আপেক্ষিকভাবেই সুখপ্রদ হয় নি।

কিন্তু আমার সমস্যাটা অন্যখানে। ভেতরের যুক্তিবোধ বলছে- পারস্পরিক শান্তি কামনা যদি শুধু মুসলিম-মুসলিমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হতে হয়, তাহলে এর বিপরীতে একজন অমুসলিমের জন্য কি শান্তির বিপরীত কিছুই কামনা করা হবে ? ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখলে তাই তো মনে হয়। কেননা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই আমাদেরকে এটা মানতে হবে যে, প্রতিটা ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী বিশ্বাসী ব্যক্তি তার স্বধর্মকেই সঠিক মনে করেন এবং অন্য ধর্মকে বেঠিক বা ভুয়া ভাবেন। যুক্তিবাদী নাস্তিক্য দর্শনে বিশ্বাসীদের কথা বাদই দিলাম, একজন উদারমনা আস্তিকের মনে কি এ প্রশ্নটা আসে না যে, সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা যদি একজনই হন তবে তাঁর অনুমোদনে পরস্পরবিরোধী এতগুলো ধর্মের সৃষ্টি কতোটা যুক্তিসঙ্গত ? অথবা তাঁর মহামহিম ক্ষমতা ও ইচ্ছার বাইরে অন্য কোন অননুমোদিত ধর্মের উৎপত্তি কী করে সম্ভব ? যদি বলা হয় একটা ধর্মের কার্যকারিতা হ্রাস বা বন্ধ করে পরবর্তী অগ্রবর্তী ধর্মের উৎপত্তি তাঁর ইচ্ছাতেই ঘটেছে, তা হলেও অনন্ত সময় বা কাল ও স্পেস প্রতীকী অর্থে যাঁর নখদর্পণে, এরকম সর্বব্যাপি সত্ত্বার আয়ত্তে সুষ্ঠু কোন পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় দূরদর্শিতার ভয়ঙ্কর ঘাটতি ও বৈপরিত্য কি আমাদেরকে প্রশ্নমুখি ও পীড়িত করে না ?

এই সব পরস্পরবিরোধী ধর্মের ভীড়ে আমি তো অমুসলিম হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষকেই সম্ভাষণ জানাতে উদ্যোগি হয়েছিলাম। ’নমস্কার’ শব্দটাও তো একটা ধর্মীয় পরিচয় বহন করে। মানুষের মধ্যে ভাব বিনিময়ে ভাষিক পরিচয়টাই তার প্রথম ও প্রধান পরিচিতি। সে ক্ষেত্রে আমি আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা তো ব্যবহার করতেই পারি। তাছাড়া কোনো ভাষা তো কোনো ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। তথাকথিত ধর্মের সর্বগ্রাসী অপক্রিয়া কি আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বকেও গ্রাস করে ফেলবে !

এই সব ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা কি মানুষের পরিচয়ে একজন মানুষের শান্তি কামনা করতে পারবো না !? #
R_d_B

Tuesday, April 22, 2008

# আমাদের সব আবেগই কি যুক্তিহীন ?




আমাদের সব আবেগই কি যুক্তিহীন ?

- রণদীপম বসু

একটু একটু করে হার্টলেস হয়ে যাওয়া এই দেশটাতে হৃদয়গত সমস্যা যে কী প্রবল তা টের পাওয়া যায় রমনা পার্ক বা এ জাতীয় উদ্যানগুলোর অন্তর্হিত নিরালা স্পটগুলোতে গেলে, অথবা নগরীর বিভিন্ন হার্ট কিনিকগুলোতে ঢু মারলে। যদিও দুটো জায়গার পরিবেশ পরিস্থিতি এবং প্রেক্ষিত ভিন্ন, দুই দল দুই ভুবনের পাত্রপাত্রী, তবু অভিন্নতা একটাই ; উভয়েই হৃদয়গত সমস্যায় তটস্থ, কখনো কখনো বিধ্বস্ত।

হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাত ধরে মিরপুর হার্ট ফাউণ্ডেশনের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। এখানে যারা আসেন, সখ করে তো নয়, দায়ে পড়েই আসেন। হার্টের কারবারি হার্টলেস চিকিৎসকদের কাছে বিধ্বস্ত হার্টের রোগিদের নিয়ে যারা আসে, আত্মীয় পরিজন তো বটেই, তাদের চোখে মুখেও বিধ্বস্ত হতে যাওয়া নিজস্ব হার্টের ছবিটাও কি বুক ফেটে বেরিয়ে আসে না ? দেখে যে বোঝার সে ঠিকই বুঝে নেয়। সব সম্ভবের এই দেশে তা আমাদের গা সওয়া এখন। অতএব ভাঙাচোরা চেহারা দেখতে দেখতে পার হয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু থেমে যেতে হলো। জটলাটা যদিও আমাদের পথচারিদের জন্য পথরোধক ছিলো না, তবু সহগামি লেখক-বন্ধু দাস প্রভাসের কৌতূহল আমার মধ্যেও সঞ্চারিত হলো।

গেটের লাগোয়া ভেতরেই একটা এম্বুলেন্সকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলাম ভেতরে। ক’টা বিষাদগ্রস্ত ছেলে-মেয়ের পাশে এক ক্রন্দনরত মধ্যবয়সী মহিলার কাতরোক্তি। সদ্যমৃত স্বামীই হবে, ধবধবে সাদা কাপড়ে মোড়ানো। পেছনের হুডখোলা এম্বুলেন্সে মৃতদেহটাকে তুলে নিতে পেশাদার হাতে টানা-হেছড়া করছে ক’জন। আর ক্রন্দনরত মহিলার বুকভাঙা কাতরোক্তি- ‘আস্তে ওঠান, ব্যথা পাইবো, আস্তে ওঠান..!’

সুখ দুঃখের উর্ধ্বে ওঠে যাওয়া মৃতের দায় তো জীবিতরাই বহন করে। যাদের উদ্দেশ্যে এই শোকাকুল অনুরোধ, তারা শুনলো কি না বোঝা গেলো না, কিন্তু বুকের কোথায় যেনো সুইয়ের মতো এসে বিঁধে গেলো কথাটা- ‘আস্তে ওঠান, ব্যথা পাইবো !’ আহ !

সংসারের মায়াবী সুখে দুঃখে পাশাপাশি বন্ধনে কাটিয়ে দেয়া দিনগুলোকে আমরা কেউ আর ফিরিয়ে আনতে পারি না। স্মৃতিটাই হয়তো আবেগ হয়ে নাড়া দেয় আমাদেরকে। কিছুক্ষণ পর যে মৃতকে কবরে শায়িত বা চিতায় ওঠানো হবে, সেই মৃতদেহের কষ্ট পাওয়ার আশংকায় কেঁপে ওঠাটা যত যুক্তিহীনই হোক, বুকের ভেতরে কোথায় যেনো একটা প্রশ্ন নাড়াচাড়া করতেই থাকে-

আমাদের সব আবেগই কি যুক্তিহীন ? #
(২০/০৪/২০০৮)
R_d_B
Image

# অদৃশ্য বাতিঘর -০২ (কবিতাগুচ্ছ)





অদৃশ্য বাতিঘর -০২ (কবিতাগুচ্ছ)
- রণদীপম বসু


অন্তরা

এখানে থেকেই যা সহেলী তুই
চোখের ডানায় নিঝ্ঝুম উড়ে চলা
নিজে নিজে কতোটা সইবি আর,
বুকটা তো ফাঁকাই কেবল
অনাদর হবে না তোর
এখানেই থেকে যা।

বুদবুদের মতোন ডুবে থাকা জলের অতল তলে
সপ্ত আকাশে তোর পাবিনে এমোন করে
আলো-আঁধারির খেলা-
থেকে যা এখানে তুই
শৈবাল গুল্মের লতানো ছায়ার ফাঁকে
তোকে নিয়ে সাঁতরে যাবো
জল-পাহাড়ের খাঁজে
রূপসী মাছেদের কেলিরত চোখে তোর
অধর-আবীর মেখে চলে যাবো
রূপোলী ঝিনুকের খোঁজে
মুক্তোয় ভরে দেবো তোকে।

পাখির পালকে আকাশটা গুঁজে রেখে
এখানেই চলে আয় তুই-
জলেও অরণ্য আছে
তোকে নিয়ে ছুঁয়ে যাবো আদিম পাথর
অরণ্যের ধার ঘেষে
পড়ে থাকা হেলায় ভীষণ ;
স্বপ্নে তোর মুগ্ধ ছোঁয়ায়
ওখানে ফুটবে হেসে পাথুরে জলের ফুল-
তোর বুকে গুঁজে দেবো।
চাইলে সহেলী তোকে নিয়ে যাবো অরণ্যে গভীর
শেখাবো গাছেদের ভাষা-
দুলিয়ে বল্লরী-শাখা গাছেরাও বলতে জানে
প্রিয়তম কথা।

থেকে যা সহেলী তুই,
দু-চোখে যা কিছু ধরে
আমার যা সবকিছুই তোকে দেবো-
চাইলে শরীরটাও খুলে দেবো তোকে
শুধুই তোকে। #
(১২/১০/১৯৯৫)
R_d_B


জলল ভাস্কর্য

জ্যোৎস্নার সাথে সঙ্গম শেষে
রাতেরা কান্ত হলে
আড়মোড়া ভেঙে বলে ওঠো তুমি-
এখনো অনেক বাকী দিনের শুরু
চলো না বেরিয়ে আসি হ্রদের কিনার,
জলল ভাস্কর্য হবো।
কিছুই বলি না আমি-
অনিচ্ছে পকেটে পুরে তোমাতেই
চলমান হই।

অরণ্য-কালোয় জলে
কে যেনো ধোয়ে দেয় চাঁদের নেংটো শরীর;
ডুবিয়ে রতিতদেহ তুমিও নেমে গেলে
জলের স্বচ্ছতায়
যুগল জ্যোৎস্না নামে
এবং রাতের শরীর হয়ে যে দেহ জড়িয়ে ধরি
সেটা কি তোমার, নাকি...
জানা হয় না আমার।

তখনো দিনের শুরু অ-নে-ক বাকি। #
(২৬/০১/১৯৯৬)
R_d_B


পাথর স্তবক

(১)
অনেক বর্ষণে মৃত্তিকা গলে যায়
পাথরেরা বদলায় না একটুও;
তুমি তো পাথরই-
ইচ্ছে হয় কান পেতে শুনি
ঐ বুকে
ভাঙনের শব্দ হয় কিনা।

(২)
কিছু কিছু মুহূর্ত আসে
পাথরও মৃত্তিকার মতো গলে যায়,
বুঝি না কেবল আমি-
কতোটা অমিল থাকে পাথর তোমাতে
আর পাথরে তোমার ?

(৩)
পাথরে কি ফোটে ফুল
দৈবাৎ কখনো ?
এটুকু জানার বাকি থাক না পড়ে;
তোমার মুখেই যখোন হাসির মঞ্জরি দেখি
থাকে না জানার বাকি-
পাথরও ফোটায় ফুল কখনো কখনো। #
(০৯/০৪/১৯৯৬)
R_d_B


স্বপ্ন-বচন

(১)
জলের চোখে চোখ রেখেছো
বুঝোনি তাও চোখের জলও হাসতে জানে,
কষ্ট বুকের গোপন ছোঁয়ায় বুঝবে কি আর
কষ্ট পেতেই কষ্টেরা যে গোপন সুরে স্বপ্ন বোনে !

(২)
গাছের কাছে মাছের কাছে
স্বপ্ন-কথা ছড়াতে নেই,
জন্মান্ধতার শতদ্রু চোখ
বুনবে কেবল অন্ধতাকেই !

(৩)
স্বপ্ন দিয়ে স্বপ্ন কেনা
জগৎ জুড়ে কী আর এমন রহস্য তায়,
মাটির বুকের স্বপ্ন-কথা বুঝবে কে আর-
ভেঙে ভেঙে স্বপ্নতাকে ছড়াতে চায় কোন্ ভাষায় !

(৪)
স্বপ্নতা আর স্বপ্নহীনায়
আছে কি আর প্রভেদ কোনো ?
স্বপ্নেরই তো আসা-যাওয়া
রূপের ভেদেই ভাসছে দুনো ! #
(১৯৯৭)
R_d_B



আবর্তন
(মা'কে মনে পড়ে)

শৈশবে মায়ের মুখে শুনেছিলাম
জীবনের গান-
বুঝিনি কিছুই
শুধু রূপকথা সুরে সুরে
ঘুমের ডানায় ভেসে চলে গেছি দূর থেকে দূরে ;
মায়ের দীঘল হাত তখনো ছড়িয়ে ছিলো
অদ্ভুত মায়ায়।

সময়ের পালকেরা তারপর উড়ে গেছে কতো !
পড়ন্ত দুপুরে এখনো সুনসান নির্জনে
কতো না কান পাতি
শৈশবে আমার-
বুকের গহীন থেকে নিশুতির কান্না কিছু
উঠে আসে ছলকে যেন প্রত্নহীন লাভায়।
সেই গান সেই সুর কোথায় হারিয়ে গেছে-
কেবল মায়ের সেই সে বাহু
এখনো জড়িয়ে রাখে নিবিষ্টে আমায়।

আসলে মানুষেরা পারে না
কখনো ছাড়িয়ে যেতে শৈশবের বন্ধন কোনো।
শৈশবেরা যায় কি ফেলে মানুষকে কখনো ?
(২৫/০৯/১৯৯৬)
R_d_B



Image

# জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন !




জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন !

- রণদীপম বসু


জ্বালানি ছাড়া কি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ? চমকে যাবার মতো কথাই বটে ! আপাত অসম্ভব এই কাজটাই সবাইকে বিস্মিত করে দেখিয়ে দিলেন ঝিনাইদহের যুবক গিয়াস উদ্দিন কচি। শনিবার (১৯ এপ্রিল ২০০৮) দুপুরে চট্টগ্রাম চেম্বার মিলনায়তনে চেম্বার কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তিটি দেখাতে প্রদর্শনীর আয়োজন করে। নিউজ, প্রথম আলো রোববার, ২০ এপ্রিল ২০০৮।

প্রদর্শনীতে এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হাতেনাতে দেখানো হয়। প্রাথমিকভাবে ডায়নামো চালুর জন্য পিডিবি’র বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় এক মিনিট। ডায়নামো চালু হওয়ার পর বিদ্যুতের সংযোগ খুলে ফেলা হয়। অবশ্য যেখানে বিদ্যুৎ থাকবে না সেখানে হাতে ঘুরিয়ে ডায়নামো চালু করা যাবে বলে জানানো হয়। এক হাজার ওয়াট বা এক কিলোওয়াট শক্তির ডায়নামোটি টানা দশ মিনিট চালিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে একটি ড্রিল মেশিন, একটি টেবিল ফ্যান ও চারটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি জ্বালানো হয়। এতে খরচ হয় ৮০০ ওয়াট। বাকি ২০০ ওয়াট বিদ্যুৎ ডায়নামোয় নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়।

পরীক্ষামূলক এই প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৫০-৫৫ হাজার টাকা। ঝিনাইদহের যুবক গিয়াস উদ্দিন কচি ১৮ বছর ধরে মোটর ও ডায়নামো দিয়ে অনুশীলন করে প্রযুক্তিটি উদ্ভাবনে সফল হন। প্রযুক্তিটির সাফল্য দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম, পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (প্রকল্প) শহীদ উদ্দিন আহমেদ, জিইসি বাংলাদেশের পরিচালক (উৎপাদন) প্রকৌশলী এ বি এম এ বাসেত, ডয়েস পাওয়ার সিস্টেমের সার্ভিস ম্যানেজার প্রকৌশলী সৌমেন চক্রবর্তী প্রমুখ। প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, এই প্রকল্প দেখে মনে হচ্ছে বিদ্যুতের তত্ত্ব (ইলেকট্রিক্যাল থিওরি) বদলে যাচ্ছে। সফল হলে এটি হবে অবশ্যই যুগান্তকারী ঘটনা। জিইসির প্রকৌশলী এ বি এম এ বাসেত বলেন, ‘প্রকৌশলী হিসেবে আমি বলবো, এটা অসম্ভব। কিন্তু চোখের সামনে যা দেখছি তা আসলে বিস্ময়কর ! উদ্ভাবককে তার কৌশল গোপন রাখা উচিৎ।’

প্রযুক্তিটির উদ্ভাবক জানান, এক কিলোওয়াট শক্তির ডায়নামোটি তৈরিতে বিশেষ ট্রান্সফরমার, সার্কিট, ডায়নামো ও মোটরযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০ কিলোওয়াট শক্তির একটি প্রকল্পেও তিনি সফল হয়েছেন। তাঁর এই উদ্ভাবনের সূত্র হলো ‘সমন্বিত চক্রাকার ব্যবস্থায় শক্তি কখনোই নিঃশেষ হয় না।’

বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই নতুন করে ভাববেন। যদি জ্বালানী ছাড়াই বিদ্যুৎ উদ্ভাবনের এই বিস্ময়কর প্রযুক্তি সত্যিই সফল হয়, তাহলে বিজ্ঞানের ধারণায় যে এক অসম্ভব বিপ্লব ঘটে যাবে তা ভাবতেও রোমাঞ্চিত হতে হয়। বিশ্ব যেখানে আগামী দিনের সভ্যতায় বিদ্যুতের অনিবার্য আবশ্যকতা পূরণের জ্বালানির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে, সেখানে এরকম একটা উদ্ভাবন অকল্পনীয় আশার সঞ্চার করে বৈ কি !

উন্নত বিশ্বের কোন জগৎখ্যাত গবেষণাগারের কোন বাঘা বিজ্ঞানী নয়, আমাদের দুর্ভাগা হতদরিদ্র এই সহায়-সম্বলহীন হতদরিদ্র দেশটির বুকে অনাদরে পড়ে থাকা মফস্বলের সুবিধাবঞ্চিত এক অতি সাধারণ যুবকের খেয়ালি সৃষ্টিতে পৃথিবীর ঘূর্ণায়মান চাকাটা এক নতুন গতিতে প্রাণবন্ত হবে !

এটা কি আদৌ সম্ভব !?
R_d_B

Monday, April 21, 2008

# ‘এই পৃথিবীতে কৃষকের মৃত্যু হবে সবার পরে !’




‘এই পৃথিবীতে কৃষকের মৃত্যু হবে সবার পরে !’

-রণদীপম বসু


‘যে মাটি ও আবহাওয়া আমরা পেয়েছি, তা পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ। সোনা ফলানো যায়। ফল রপ্তানি করেই কোটি কোটি টাকা আমরা আয় করতে পারি। কারণ আমাদের দেশের ফলের স্বাদ অন্য দেশের চেয়ে উৎকৃষ্ট। সেটা আমাদের মাটির কারণে। সার প্রয়োজন নেই। গাছের ঝরা পাতাই যথেষ্ট।’

কথাগুলো বললেন চাষা আজিজ কোম্পানী। এবার পয়লা বৈশাখে তাঁর আমন্ত্রণে টাঙ্গাইলের শালিয়াপহ গ্রাম ঘুরে এসে প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ প্রথম আলোয় (শনিবার ১৯ এপ্রিল, ২০০৮) তাঁর নিয়মিত ‘জীবনের সাইকেল’ কলামে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন সংক্ষেপে।

চাষা আজিজ কোম্পানী তার কয়েক একর জায়গায় শত শত প্রজাতির ফলদ বৃক্ষ, নানা ধরনের লেবু, আপেল, বরই, সফেদা, কমলালেবুসহ নানা ধরনের ফলের উৎপাদনেই থেমে থাকেন নি। তৈরি করেছেন অভয়ারণ্য। কারণ পশুপাখির সংস্রবও গাছের জন্য জরুরি। এটা তার দীর্ঘ ১৩ বছরের গবেষণার ফল। তাও আবার কোন গবেষণাগারে নয়, নিজের মাটিতে। চার বছর তিনি মাটিতে শুয়েছিলেন, মাটির ভেতরের শক্তিটা অনুধাবনের জন্য, ঋতু অনুভব করার জন্য। কখন কোন্ ঋতুতে মাটি কেমন হচ্ছে। মাটি কি ফসল নিতে প্রস্তুত ? তার কথা- ফলকে যদি সারমুক্ত রাখা যায়, ফলে যদি যথার্থই স্বাদ থাকে, তাহলে রোগের জন্য কোনো ওষুধের প্রয়োজন নেই। মায়ের শালদুধে যেমন শিশুর সব চিকিৎসা রয়েছে, তেমনি ঋতুর ফলের মধ্যেই প্রকৃতি সেই সময়ের সব ওষুধের ব্যবস্থা রেখেছে।

যে ভুল প্রযুক্তির জন্য এ দেশের খাদ্য উৎপাদন সংকুচিত, পানি অনিশ্চিৎ, দেশ মরুভূমির পথে এবং দুর্নীতি করার সুযোগ সৃষ্টিই ছিল এসবের নেপথ্যে, যার ফলে দুর্নীতিবাজদের কবলে পড়ে দেশটা দ্রুত পঙ্গুত্বের দিকে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে ক্ষোভে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন আজিজ কোম্পানী- '২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হতে পারে, যদি কৃষককে নিয়ে সরকার পরিকল্পনা করে। কৃষি ভিত্তিক দেশের সংবিধানে এ বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।
কৃষি যে এক ধরনের আরাধনা, এবং সে আরাধনা যদি সততার সঙ্গে করা যায়, তাহলে প্রকৃতির হাতও উদার হয়ে যায়। এ জন্যেই হয়তো মামুনুর রশীদের কলমে আজিজ কোম্পানীর দার্শনিকতার ছোঁয়া লাগা বক্তব্যে চমকে ওঠি-
‘এই পৃথিবীতে কৃষকের মৃত্যু হবে সবার পরে, কারণ সে প্রকৃতির সন্তান। আপনারা যাঁরা কৃত্রিম শহুরে, ওষুধনির্ভর সভ্যতার মধ্যে বসবাস করেন ; তাঁদের মৃত্যু হবে আগে।’

বুকে লেগে থাকা মাটিবর্তী মানুষের কী অদম্য বিশ্বাস ! আমাদেরও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় ! ধন্যবাদ মামুনুর রশীদকে, প্রকৃতির সন্তান একজন চাষা আজিজ কোম্পানীকে চিনিয়ে দেয়ার জন্য; এবং আমাদেরও...!

(২০/০৪/২০০৮)
R_d_B