| বিজয় বনাম অভ্র বিতর্ক, ভাষা উন্মুক্তির লক্ষ্যটাই নির্ধারণ করে দিলো...|
-রণদীপম বসু
...
'আহ্লাদে গদগদ, ভূমিতে না পড়ে পদ', ছোটবেলায় মা-মাসিদের কাছে শুনা এ কটাক্ষপূর্ণ ছন্দময় বাক্যবন্ধটায় বেশ আমোদ পেতাম। 'মুই কি হনুরে' জাতীয় আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেলে মানুষ যে কতোটা অহঙ্কারি হয়ে ওঠে, তারই প্রবাদতুল্য নমুনা-বচন এটা। এমন অবস্থায় এলে নাকি মানুষের পা তখন আর বাস্তবের মাটিতে পড়তে চায় না। আর বাস্তববিবর্জিত হলে যা হয়, একটু চিপায় পড়লেই যুক্তিহীন আবোলতাবোল বকতে থাকে। তার সাথে যদি ক্ষমতার মদমত্ততা যুক্ত থাকে, তাইলে তো আর কথাই নেই। ধরাকে সরা জ্ঞান করে এরা এই বোধটুকুও হারিয়ে ফেলে যে, 'কাউকে কাউকে সবসময় বোকা বানানো যায়, সবাইকে কিছুদিন বোকা বানানো যায়, কিন্তু সবাইকে সবসময় বোকা বানানো যায় না'।
ইতিহাসে নজর দিলে এই আলামত দেখতে পাই আমরা বাংলা ভাষা আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্'র আচরণে। তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর এই ব্যক্তি ঢাকায় এসেই যখন বড়ো অহঙ্কারি স্বরে তাঁর স্বভাবসুলভ ইংরেজিতে বলে ওঠেন- উর্দু, এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, মুখের উপর বাঙালির পুচকে দামাল ছেলেমেয়েরা তাঁর মুখের কথা পড়তে না পড়তেই 'নো নো' বলে চিৎকার করে ওঠে সমুচিত জবাব দিয়ে তাঁর দর্প চূর্ণ করে দেয়। এরপর বাঙালি বুকের রক্ত দিয়ে গোটা দুনিয়াকে জানিয়ে দিলো, মায়ের ভাষার কোন বিকল্প হয় না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরকম নজির ভুরি ভুরি রয়েছে।
ভিন্নভাষী জিন্নাহ্'র এই রাজনৈতিক চালবাজীর না হয় একটা যুক্তি মেলে। কিন্তু বহুকাল পরে এসে একজন সামান্য বাঙালি ব্যক্তিও যখন সাময়িক পরজীবী ক্ষমতার ফানুসে ভেসে নিজস্ব অন্ধতাকে কিছু বালখিল্য মন্তব্যের স্রোতে ভাসিয়ে একটা অহেতুক বিতর্কের ঝড় বইয়ে দেয়, তখন তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধি-সুস্থতার প্রশ্ন তো জড়িত হয়ই, সাথে সাথে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার একটা নিকৃষ্ট নমুনাও তৈরি হয়ে যায় বৈকি। বাঙালি হয়েও ভাষার ব্যাপারী এই ব্যক্তি কি আজো বুঝেন নি যে, ভাষার প্রশ্নে বাঙালি কখনো আপোস করে না !





